শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০
করোনা-নাট্য : কুশীলবরা কে কোথায়?
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
Published : Tuesday, 28 July, 2020 at 12:11 PM

ঢাকার এক বন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। তাঁকে বললাম, দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে; কিন্তু দিবস পালন ছাড়া দলের কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে না। তার কারণটা না হয় বুঝি। কিন্তু বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত একেবারেই নিষ্ক্রিয় কেন, তার কারণটা বুঝি না। আর কিছু না হলেও আগে বিএনপির ফখরুল, রিজভী সাহেব এবং তাঁদের নতুন অঘোষিত নেতা ড. কামাল হোসেনের মুখে প্রতিদিনে না হোক প্রতি সপ্তাহে সরকারের সমালোচনামূলক এক বা একাধিক বিবৃতি থাকত। এখন তা-ও নেই। ব্যাপারটা একটু বেখাপ্পা ঠেকছে।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম যখন ক্ষমতায় ছিল তখন বর্ধমানে ছিল দলটির খুব শক্ত ঘাঁটি। এই ঘাঁটি ভেঙে যেতেই বিরোধী কংগ্রেস দল ছড়া তৈরি করেছিল, ‘তাই তাই তাই/বর্ধমানে গিয়ে দেখি সিপিএম নাই।’ বাংলাদেশে এখন যদি এই ছড়ার অনুকরণ করে কেউ নতুন ছড়া কাটে, তাহলে কেমন হয়? ‘তাই তাই তাই/বাংলাদেশে গিয়ে দেখি বিএনপি নাই।’

বন্ধু বললেন, বিএনপির প্রতি এত অকরুণ হবেন না। করোনা রাজনীতিকে দেশছাড়া করেছে। বিএনপি নেতারা করোনার কোপে দেশছাড়া হননি, তবে সবার মতো গৃহবন্দি হয়েছেন। গৃহবন্দি অবস্থায় করোনার ভয়ে নির্বাক হয়ে আছেন। এমনও হতে পারে, তাঁদের কাছে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। আগেও ছিল না। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিই ছিল তাঁদের একমাত্র রাজনৈতিক মূলধন। তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার পর সেই মূলধনও আর নেই। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা কথা বলবেন, তার সুযোগও নেই। করোনা মোকাবেলায় সরকারের অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি আছে। কিন্তু সেই ত্রুটিবিচ্যুতি অনেক উন্নত দেশের চেয়ে কম।

বন্ধুর কথা মেনে নিলাম। কিন্তু বিস্ময়ের কথা এই যে লন্ডনে করোনা পরিস্থিতি এখন অনেকটা উন্নত। কিন্তু লন্ডনে বসবাসকারী বিএনপির যুবরাজের কণ্ঠেও টুঁ শব্দটি নেই। ভারতে কভিড-১৯-এর এত বড় প্রকোপের মধ্যেও বিরোধী কংগ্রেস দলের রাহুল গান্ধীর কণ্ঠ মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে। ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তাঁর সরকার পরিচালনা নিয়ে রোজই সমালোচিত হচ্ছেন। বেচারা নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে কোনো রকমে বেঁচে উঠেছেন। তাতেও তাঁর রেহাই নেই। ওদিকে আমেরিকায় তো করোনায় এত বড় বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে গেছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনও নিষ্ক্রিয় নেই। তিনিও মাঠে সরব ও সক্রিয়।

দেশের করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসিনা সরকার সম্পূর্ণ একা। মনে হয়, আর কারো কোনো দায়দায়িত্ব নেই। বিরোধী দলের একমাত্র ড. কামাল হোসেন একবার ঘরে বসে একটি বিবৃতি দিয়ে সরকারকে সবার সহযোগিতা নিয়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার উপদেশ দিয়েছিলেন। উপদেশ দিয়েই তিনি খালাস। এই সহযোগিতা তাঁরা কিভাবে দেবেন, করোনার দরুন মাঠে না নেমে ঘরে বসে কিভাবে করোনা মোকাবেলায় তাঁরা ভূমিকা রাখতে পারেন তার কিছুই তিনি ব্যাখ্যা করেননি।

এ ক্ষেত্রে অন্য দেশে কী ঘটছে তার উদাহরণ দেওয়ার দরকার নেই। তা মিডিয়ার মাধ্যমে সবারই জানা। কিন্তু বাংলাদেশে করোনার হামলায় আতঙ্কিত মানুষের মনে সাহস জোগানো, তাদের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে ক্যাম্পেইন চালানো, সরকারের কাজের ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধনের জন্য পরামর্শ দান—এ কাজগুলো অন্তত তাঁরা করতে পারতেন।

এ কথা এখন সবার জানা, ব্যবসায়ীদের চাপে লকডাউন শিথিল করা এবং গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো আগে আগে খুলে দেওয়া ভুল হয়েছিল। তারপর সাধারণ মানুষও আর স্বাস্থ্যবিধি তেমন মানছে না। এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পুলিশ ক্রমাগত রাস্তায় টহল দিয়ে এবং লাঠিপেটা করে মানুষকে এই আইন মানাতে পারে না। এ জন্য দরকার ছিল স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী ক্যাম্পেইন। এই ক্যাম্পেইন সরকারি দল যেমন করেনি, বিরোধী দলও করেনি। এই ক্যাম্পেইন পরিচালনায় সরকারকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে প্রধান বিরোধী দলটি দেশের দুর্দিনে রাজনৈতিক ঐক্য ও সহযোগিতার একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারত। তাতে তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যেত।

এখন তো মনে হয়, দেশে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির কোনো অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্ব থাকলে এই কোরবানির ঈদের সময় তাদের একটা ভূমিকা প্রত্যাশা করা যেত। আশঙ্কা হয়, কোরবানির ঈদে গো-হাট, বাজার ও ঈদের জামাতগুলো যদি কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে করোনাভাইরাস ছড়ানোর তা হবে নতুন উৎস। সরকার বেশি কঠোর হলে মূর্খ ধর্মান্ধরা প্রচার চালাতে পারে—ইসলামের অবমাননা করা হচ্ছে। এবার অবশ্য সৌদি আরবেও হজ উপলক্ষে বিদেশি মুসলমানদের সৌদি আরবে গমন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য শুধু আইনের ওপর নির্ভর করা চলবে না। বিশাল ক্যাম্পেইন দরকার। সেটি সরকারের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। এই ক্যাম্পেইন চালানোর জন্য সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর যেমন সক্রিয় হওয়া উচিত, তেমনি সক্রিয় হওয়া উচিত বিরোধী দল এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও।

ছোটবেলায় (বাংলা ১৩৫০ সনে) সেই পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ ও মহামারির সময় দেখেছি, বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনও ত্রাণকাজে নেমেছে। তাদের মুখে গান ছিল :

‘ও ভাই বাংলা হইলো খালি

মানুষ মরে ভাতের লাইগ্যা

হইয়ারে কাঙালি।

বাংলা হইলো খালি।’

কিংবা সেই বিখ্যাত গানটি শোনা যেত :

‘ভিক্ষা দাও গো ভিক্ষা দাও গো

ভিক্ষা দাও গো, পুরবাসী

এসেছি আজি তোমারি দ্বারে

সন্তান তব উপবাসী।’

এই গান গেয়ে ত্রাণকর্মীরা রাস্তায় নামতেন সাহায্য সংগ্রহের কাজে। করোনায় রাস্তায় নামার উপায় নেই। কিন্তু এখন অত্যন্ত শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে ঘরে বসেই এ কাজটি করা যায়। বাংলাদেশে এ কাজ হচ্ছে কি না, জানি না। ইউরোপে হচ্ছে। ব্রিটেনে এনএইচএস বা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস সরকারি সংস্থা, তারা বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাচ্ছে লকডাউন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি শিথিল করার পরও তা মেনে চলার জন্য। পাশাপাশি আইনও কাজ করছে। সরকারি-বেসরকারি যানবাহনে মুখ মাস্কে ঢেকে চলাচল না করলে অর্থদণ্ড এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা না মানলে আরো অধিক দণ্ড।

সরকারের ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি চলছে বেসরকারি ক্যাম্পেইন ও ত্রাণ তৎপরতা। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলো এবার লন্ডনে ত্রাণ তৎপরতায় প্রচুর প্রশংসা অর্জন করেছে। তারা অনেকে করোনায় ভয়ানক বিপর্যয়ের সময় বিভিন্ন গৃহে, হাসপাতালে নিজেদের উদ্যোগে খাদ্য বিতরণ করেছে। বিভিন্ন ইয়ুথ গ্রুপ স্বেচ্ছাসেবী হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে ঘরে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য সাহায্য পৌঁছে দিয়েছে। ফলে সরকারের ওপর ভার অনেকটা লাঘব হয়েছে। এই বেসরকারি প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তার ওপর ইয়াং ব্রিটিশ কবি, বাচিকশিল্পী, সংগীতশিল্পীরা তো সাধারণ মানুষকে অহোরাত্র কবিতা ও গান শুনিয়ে সাহস জোগাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছেন ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁর ভাষণে ‘উই উইল মিট অ্যাগেইন’—এই অমর গানের পঙক্তিটি প্রচার করে।

শুনেছি, সদ্য শেষ হওয়া কৃষি মৌসুমে বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি ও প্লাবন থেকে ফসল রক্ষার জন্য ছাত্রলীগ, যুবলীগ, এমনকি সিপিবির কর্মীরা মাঠে নেমে কৃষককে ফসল কেটে গোলায় তুলে দিয়েছেন। এটি অবশ্য করোনা শুরু হওয়ার আগের কথা। করোনা শুরু হওয়ার পর ব্রিটেনের বিভিন্ন দলের ইয়ুথ গ্রুপের মতো ছাত্রলীগ, যুবলীগ অথবা বিরোধী দলের যুব সংগঠনগুলোতে করোনার দুর্গতি লাঘবে ব্যাপক তৎপরতার কোনো খবর চোখে পড়েনি। করোনা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য কোনো ক্যাম্পেইন সংগঠনের খবরও পাইনি। সবাই যেন সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বসে আছে।

তবে ঢাকা থেকে খবর পেয়েছি, কিছু প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক গ্রুপ তাদের সীমাবদ্ধ শক্তিতে এলাকাবিশেষে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছে। বিভিন্ন দলের যুবশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে এই স্বেচ্ছাসেবী কাজ আরো বাড়ানো উচিত এবং যত দিন করোনার ব্যাপক সম্প্রসারণ না কমে তত দিন এই তৎপরতা অব্যাহত থাকা উচিত। এই কাজটি করার জন্য দেশের ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য সংগঠনের দায়িত্ব রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী ক্যাম্পেইন চালানো দরকার। এক শ্রেণির অজ্ঞ ও মূর্খ মোল্লার প্রচারণার ফাঁদে যেন সাধারণ মানুষ না পড়ে সে জন্য মসজিদে মসজিদে এই ক্যাম্পেইন চালানো উচিত। সব দল মিলে এই ক্যাম্পেইন চালালে তা সাধারণ মানুষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।

এবার করোনায় একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়েছে। জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি আছে। সেই সাংগঠনিক শক্তি দেশময় সন্ত্রাসের ছুরি চালাতে যতটা পারদর্শী, করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে ততটা পারদর্শী অথবা ইচ্ছুক নয়। করোনার সুযোগ নিয়ে মাঝখানে তারা খোলস পাল্টে নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিল। দেশের মানুষ রাজাকার রাজাকার বলে চিৎকার করতেই তারা আবার ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়েছে। বিএনপি তাদের আত্মার আত্মীয় (যুবরাজ তারেকের মতে)। তারাও এখন জামায়াতের পন্থা অনুসরণ করে রাজনীতিতে গায়েব। এই গায়েবি রাজনীতিকরা করোনা একটু শেষ হলেই আবার আবির্ভূত হবেন সন্দেহ নেই। বেরোবেন নতুন দেশপ্রেমিকের সাজে। তার আগে দেশবাসীর এই দুর্দিনে এই প্রেমটা একটু দেখালে কি ভালো হয় না? তাতে করোনাদুর্গতদের একটু সেবা হয়। 


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি