রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন কতটুকু?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 7 June, 2021 at 8:10 PM

নারীর ক্ষমতায়নের এ যুগে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন কমেছে, না বেড়েছে? হু হু করে বেড়েছে এবং বাড়ছে। প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাও তাই। কলকাতায় ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ কাগজ হাতে পাই। পত্রিকার পাতা খুললেই নারী ধর্ষণের খবর। শিশু নির্যাতনের খবরও আছে। তবে তুলনামূলকভাবে কম। ভারতে নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে দারুণ আন্দোলন হয়েছে। সরকার নারী ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেছে। তারপরও নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। বাংলাদেশের অবস্থাও তাই। একাধিক লোমহর্ষক নারী ধর্ষণ ও হত্যার পর সরকার এ দেশেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেছে। তাতে নারী ধর্ষণ কমল কই? বেশ কিছুকাল আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে রাস্তার এক পাগল পর্যন্ত ধর্ষণ করেছে। সরকার বহু ক্ষেত্রেই ধর্ষকদের ধরে সাজা দিচ্ছে। তাতে ধর্ষণ কমল কোথায়? এই না কমার কারণ কী?

লন্ডনের একটি বাংলা সাপ্তাহিকের পাতা উলটাচ্ছিলাম। পাতাভর্তি কেবল নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ অথবা এ নির্যাতন সংক্রান্ত খবর। প্রথম খবর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে এক গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। পুলিশ অবশ্য সব অপরাধীকেই গ্রেফতার করেছে। দ্বিতীয় খবর, নবীগঞ্জ উপজেলার আজলপুর গ্রামে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী মৌসুমী আখতারকে কুপিয়ে মারার চেষ্টা। মৌসুমী এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তার স্বামীকে অবশ্য আটক করা হয়েছে।

তৃতীয় খবর, ‘চলন্ত বাসে তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণ।’ গ্রেফতার ছয় ব্যক্তি। ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে এক ২২ বছরের তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে। বাসটির চালক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। দিল্লির নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল বাসের ভেতর। বাংলাদেশ এবং ভারত-দুদেশেই বাসের ভেতরেই নারী নির্যাতন বেশি বাড়ছে।

চতুর্থ খবর, ‘ধর্ষণের পর তার ভিডিওচিত্র দেখানোর ভয় দেখিয়ে ফের ধর্ষণ।’ এ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বহু তরুণী। তাদের মধ্যে একজন শাপলা, তার ওপর সজীব নামে এক যুবকের অত্যাচারের কাহিনি বলেছেন। শাপলা আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। পুলিশ এ সজীব বাবাজিকে এখনো ধরতে পারেনি। পঞ্চম খবরটি হচ্ছে, নারী পাচারের ব্যবসায়ের হোতা টিকটক হৃদয়ের শত শত নারীর জীবন নিয়ে নির্দয় খেলা। তার নারী পাচারের ব্যবসা ভারত, পাকিস্তান হয়ে দুবাই পর্যন্ত বিস্তৃত। নানা প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের জালে আটকানো হয়। তারপর দেশ-বিদেশের পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়। পুলিশ এ পাচারচক্রের অপরাধীদের ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্ভবত হৃদয় এবং তার কয়েকজন সহযোগী ভারতে ধরা পড়েছে।

ভাগ্যের পরিহাস এই যে, বাংলাদেশে এখন নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি জোরেশোরে চলছে। দেশের সরকারপ্রধান নারী, প্রধান বিরোধীদলের নেত্রী নারী, এমনকি জাতীয় সংসদের স্পিকারও একজন নারী। পুলিশ বিভাগসহ প্রশাসনের সর্বত্র কর্মচঞ্চল নারীদের দেখা যায়। সাংবাদিকতায় নারীরা কতটা দুঃসাহসী হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক রোজিনা সংক্রান্ত ঘটনায়। দেশের সংসদে নারী নেতা আছেন। আদালতে নারী জজ আছেন। প্রশাসনে নারী অফিসার আছেন। তারপরও বাংলাদেশে নারী নির্যাতন দ্রুতগতিতে বাড়ছে। তার কারণ কী?

কারণটা সরকারের অক্ষমতা ও অনাগ্রহের মধ্যে নয়, কারণটা রয়েছে সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে। বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয় এমন স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের প্রলেপ দিয়ে এই সামাজিক ক্ষত ঢাকা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এ ক্ষতটা কত গভীর তা বোঝা যায়। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ আগে যেখানে ছিল চিহ্নিত একদল অপরাধী বা একশ্রেণির অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ, এখন তা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, নব্যধনী শ্রেণি এবং পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে। স্কুল ও কলেজে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ক্লাস পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অধ্যাপক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, এমনকি মাদ্রাসার আলেম ও কুতুব শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র ধর্ষণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। জন্মদিনের পার্টির নাম করে সহপাঠী ছাত্রীকে হোটেল কক্ষে নিয়ে গণধর্ষণের কাহিনিও এখন সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় প্রায়ই পাওয়া যায়।

বোঝা যায়, আমাদের সামন্তবাদী দেশটা দ্রুত ধনবাদী দেশ হয়েছে। ধনবাদী সমাজের সব ‘গুণ’ দ্রুত অর্জন করেছে। ধনবাদী সমাজের বর্তমান গুণ হচ্ছে, দ্রুত অতীতের সব মূল্যবোধ বর্জন। ‘পরনারী মাতৃবৎ’-প্রাচীন হিন্দু সমাজের এই নীতিবোধসহ সব নীতিবোধ বিসর্জন। ধনবাদী সমাজের নীতি হচ্ছে ভোগ, যথেচ্ছ ভোগ এবং অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার। এদিক থেকে সমাজে সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণি নারী। তার ওপর বল খাটিয়েই পুরুষ তার আধিপত্যের স্বাদ পায়। মনস্তত্ত্ববিদদের অনেকে বলেন, পুরুষরা যে কেবল ভোগের জন্য নারী নিগ্রহ করেন তা সবসময় সঠিক নয়। ধর্ষণকারী অনেক সময় নারী নির্যাতন দ্বারা তার মনের গোপন আধিপত্য বোধটাকে তৃপ্ত করে। বাঘ সবসময় ক্ষুধার জন্য প্রাণী হত্যা করে না। তার বিক্রম প্রকাশের জন্যও করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী শুধু লালসার বশে কয়েক লাখ বাঙালি নারীকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা করেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধে যত তারা পেরে উঠছিল না, ততই বেপরোয়া হয়ে নারীদের ওপর তাদের বিক্রম প্রকাশ করত। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্যাতিত এক বীরাঙ্গনার কাছে শুনেছি যে, পাঞ্জাবি সৈন্যটি তাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল, সে তাকে রোজ ধর্ষণ করত না। ধর্ষণ করত আকস্মিকভাবে কখনো-সখনো। কিন্তু রোজ তার শরীরের নানা স্থানে লাথি মেরে বলত- ইয়ে বাঙালি কুত্তা, কোন্ তোমলোগকো বাঁচায়েগা, কিধার হায় তুমহারা মুক্তিফৌজ?

সমাজের উঁচু স্তরে কিছু নারীকে ক্ষমতায় বসিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন হয় না। সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা দ্বারা তাদের সব হয়রানি অনেকটা দূর করা যায়। ভারতে নারী ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, বাংলাদেশেও তাই। তাতে নারী ধর্ষণ কমেনি। আজ যদি দুটি দেশেই সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের সমানাধিকার দেওয়া হয়, নারীর সুযোগ ও পরিসর বাড়ে, তাহলে দেখা যাবে কঠোর আইন করে যা করা যায়নি, তা করা যাবে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ কমানো যাবে।

আমি জানি না, স্কুল-কলেজে ছাত্রদের মতো ছাত্রীদেরও কেন ব্যায়াম ও যোগ শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সৌদি আরবে ও ইরানে তো এখন নারীদের ব্যায়াম শিক্ষা স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এমনকি মিলিটারি ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সেখানে পিছিয়ে থাকার কারণ কী? কেবল পুলিশ দিয়ে এবং আইন খাটিয়ে আমাদের শিক্ষিত-অশিক্ষিত নারী সমাজের সম্ভ্রম রক্ষা করা যাবে না। নারীকেই তার নিজের সম্ভ্রম রক্ষার সুযোগ দিতে হবে। পুলিশ ও আইন নারীকে সেখানে শুধু সাহায্যদান করবে। শাস্তি দেওয়ার জন্য অপরাধীদের ধরবে।
পুলিশ বলে, আমরা কী করে অপরাধীদের দমন করব? আমরা তো তাদের ধরি। জাঁদরেল উকিলরা মোটা টাকা ফিস নিয়ে তাদের জামিনে মুক্ত করে আনেন। জামিনে মুক্ত হয়ে এসে তারা ভিকটিমদের ওপর আরও অত্যাচার চালায়। আমরা অসহায়। অনেক সময় ক্ষমতাসীন রাজনীতিক থানায় টেলিফোন করেন। আমরা রাঘববোয়াল দুষ্কৃতদের পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হই।

বহু পুলিশ অফিসারের কাছে এ অভিযোগ শুনেছি। সমাজে নারী নির্যাতন বন্ধ করা, ধর্ষকদের দমন করা সহজ কাজ নয়। সহজ কাজ হলে পশ্চিমা অতি উন্নত শীর্ষ সমাজে ‘মি-টু’ আন্দোলন হতো না। ব্রিটেনের রানির পুত্র এনড্রুজ অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর সঙ্গে যৌনক্রীড়ার অভিযোগে রাজপরিবারের সুবিধা হারাতেন না। ধনবাদী সমাজের সব স্তরে নারী নির্যাতন চলছে। অনুন্নত সমাজে রয়েছে বহু বিবাহ। উন্নত সমাজে রয়েছে ক্লাব গার্ল, পার্সোনাল সেক্রেটারি। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিটারেল্ড বলেছিলেন, ‘নারীঘটিত অভিযোগে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে তার মন্ত্রিসভায় একজন সদস্যও থাকবে না।’

এটা তত্ত্ব কথা নয়। সমাজে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে আইন ও তার প্রয়োগ যেমন কঠোর করতে হবে, তেমনি নারীকে সমাজে পুরুষের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা দিতে হবে। কিন্তু ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক দেশে তা কতটা সম্ভব?


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী: মোবা: ০১৩১২৩৩৩০৮০।  প্রকাশক: মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী।
সহ সম্পাদক- রুবেল হাসান: ০১৮৩২৯৯২৪১২।  বার্তা সম্পাদক : জসীম উদ্দিন : ০১৭২৪১২৭৫১৬।  চীফ রিপোর্টার: ডিবি বৈদ্য: ০১৭৩৬-১৪৯২১০।  সার্কুলেশন ম্যানেজার : আরিফ হোসেন জয়, মোবাইল ঃ ০১৮৪০০৯৮৫২১।  রিপোর্টার: ইফাত হোসেন চৌধুরী: ০১৬৭৭১৫০২৮৭।  রিপোর্টার: নাসির উদ্দিন হাজারী পিটু: ০১৯৭৮৭৬৯৭৪৭।  মফস্বল সম্পাদক: রাসেল: মোবা:০১৭১১০৩২২৪৭   প্রকাশক কর্তৃক ফ্ল্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।  বার্তা, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ: ০২-৪১০২০০৬৪।  ই-মেইল : [email protected], web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি