বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, 2০২1
মুনিয়ার বোনের সৃষ্ট রহস্যময়তার জট খুলতে শুরু করেছে
Published : Monday, 10 May, 2021 at 6:33 PM

নিজস্ব প্রতিবেদক:
মোসারাত জাহান মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়াকে ঘিরে নানা রহস্যময়তা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। মুনিয়ার আত্মহত্যাকে ঘিরে এ পর্যন্ত নুসরাতের কোনো কথারই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মিডিয়ার সামনে তার একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্যে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারাও রীতিমত অন্ধকারে পড়েছেন। নুসরাতের বক্তব্য, এই ঘটনার সময় তার ব্যবহার করা গাড়ি, সেই দিন সঙ্গে থাকা লোকজন, মুনিয়াকে কেনো বনানী, গুলশানে বারবার দামি বাসায় রাখতে নিজের নামে ভাড়া নেওয়া, তার চলাফেরা, বিভিন্ন স্তরের যোগসূত্রিতা নতুন নতুন রহস্যের জানান দিচ্ছে। তার প্রতিটি তথ্য আর কথাবার্তাই অসংলগ্ন। তিনি একদিকে তথ্য গোপন করে চলছেন, অন্যদিকে অসত্য তথ্য প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বারবার ধাধায় ফেলে দিচ্ছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নুসরাত মূলত বিশেষ কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে নির্দ্দিষ্ট টার্গেট নিয়ে নানাবিধ বক্তব্য দিচ্ছেন।তিনি আড়াল করতে চান গত মুনিয়ার গত ৬ বছরের নানা ঘাটে যাওয়া, চলচ্চিত্রের বারোরকমের মানুষের সাথে মেশা, অভিজাত পাডায় চলা, পাঁচ তারকা হোটেলে পার্টি করা, রাত কাটানোর বিষয়গুলো।

সূত্র মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে কুমিল্লায় মুনিয়ার স্কুল ড্রপ আউট হওয়ার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তিনি নিজেই মুনিয়াকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তবে কুমিল্লায় থাকাবস্থায়ই বিবাহিত পুরুষ নিলয়ের সঙ্গে মুনিয়ার পালিয়ে বিয়ে করা, মামলা করা বিষয় নিয়ে মুখ খুলেছেন। দুই সন্তানের জনক নিলয়ের ঘর সংসার থাকার পর দুই বোন তাকে বিয়ের নামে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করেছেন। ওই বিয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে নাবালিকা বোনের পক্ষে মামলা করে মুনিয়ার প্রথম স্বামী নিলয় থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পয়সাও হাতিয়ে নেন নুসরাত। এরপর ঢাকায় এসে নুসরাত নিজেই বোন মুনিয়াকে সিনেমা জগতের নানা ঘাটে পরিচয় করিয়ে দেন। একপর্যায়ে অভিনেতা বাপ্পীরাজের গলায় ঝুলে পড়েন মুনিয়া। দুই বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করার জন্য তিনি বাপ্পীরাজের বাসায় অনশন পর্যন্ত করেছেন। সবকিছুই ছিল নুসরাতের জানা। বাপ্পীরাজকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হলে নুসরাত নিজেই মুনিয়াকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বনানীতে এক বাসা ভাড়া নিয়ে দেন। নিয়ে যান ড্যান্স ক্লাব থেকে শুরু করে পাঁচ তারকার হোটেল শোতেও। নুসরাতের হাত ধরেই পাপিয়া ও পিয়াসা সিন্ডিকেটের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে মুনিয়ার। একপর্যায়ে নুসরাতই মুনিয়াকে বনানীর বাসা থেকে গুলশানে এক লাখ ১১ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ার বাসাটি ভাড়া নিয়ে দেন। স্বামী ও ছোট বোন মুনিয়াকে নিয়ে এ বাসায় থাকার কথা বলেই ভাড়া নিয়েছিলেন নুসরাত। অভিভাবক হিসেবে নিজেদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানের তুলনায় অনেক বেশি আভিজাত্যে মোড়া বাসাটি কেন কি উদ্দেশ্যে কেবল একমাত্র বোনের থাকার জন্য তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ বাসার পরিবেশকে পুঁজি করেই একের পর এক ধনাঢ্য বিত্তশালীদের টার্গেট করে নানারকম বাণিজ্য ফেঁদে বসা হয় বলেই মনে করছে পুলিশ।

শুরুতে নুসরাতের হাত ধরে নানা ঘাট চিনলেও শেষ দিকে মুনিয়া নিজেই হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া বাণিজ্যের শিরোমণি। সর্বত্র ছিল তার যাতায়াত। নেশার রাজ্য থেকে দেহ বাণিজ্যের ঘাট পর্যন্ত বহুমুখী প্রতারণার সকল ক্ষেত্রেই তার ছিল অবাধ বিচরণ। রাজধানীর নামিদামি আবাসিক হোটেলগুলোতেও তার সচরাচর বিচরণের কথাও জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট অনেকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছেন, নামিদামি আবাসিক হোটেলগুলোর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সন্ধান করলেই মুনিয়ার আরো নানা অপরাধ অপকর্মের কাহিনী বেরিয়ে আসবে। মুনিয়া ও নুসরাতের সঙ্গে পরিচিত অনেকেই বলেছেন, আসলে নুসরাতের লোভের বলী হয়েছেন মুনিয়া। সাধারণ একজন ব্যাংক কর্মচারী হয়ে নুসরাতের জীবনযাপন, অঢেল সহায় সম্পদ, অভিজাত বাড়ি, গাড়ির হিসেব মেলে না কোনোভাবেই। নুসরাতের আপন চাচা, ভাইসহ আত্মীয় স্বজনরাও নুসরাতের হঠাত বিত্তশালী হয়ে উঠার ভেদ কাহিনীর কিছুই বুঝে উঠতে পরছেন না। নুসরাত, তার স্বামী ও মুনিয়ার ব্যাংক একাউন্ট তল্লাশি করলে আরো রহস্যময়তার সূত্রপাত ঘটবে বলেও পরিচিতজনরা দাবি করেছেন। তারা বলেন, এ তিন জনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসমূহের কল লিস্ট এবং কথোপকথন যাচাই করা হলে জানা যাবে সকল কাহিনীর নেপথ্য তথ্য।

এদিকে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসার আগেই ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’ সংক্রান্ত মামলা দায়েরসহ তড়িঘড়ি নানা তৎপরতায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টিতে রীতিমত অবাক বনেছেন। তারা বলেছেন, যেখানে পোস্টমর্টেম রিপোর্টেই প্রমাণিত হবে যে মুনিয়া আত্মহত্যা করেছে নাকি হত্যার শিকার হয়েছে। তার আগেই আত্মহত্যার প্ররোচনা সংক্রান্ত মামলা রুজু করে কী বিশেষ কিছু ধামাচাপা দেয়ার পাঁয়তারা চালানো হয়েছে? এ প্রশ্নই উঠেছে ঝানু গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মুখেও।

মুনিয়ার আত্মহত্যা নিয়ে যে অপমৃত্যুর মামলা সেটি তদন্ত করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এই মামলার বাদী মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত। মামলাটির তদন্ত খতিয়ে দেখতে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশেষ করে এই মামলা করার পেছনেরে মোটিভ এখন তদন্ত তদারককারীদের মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে নুসরাত নির্মোহভাবে ন্যায়বিচার প্রত্যাশী হয়ে মামলাটি করেনি বরং তিনি মামলা করতে গিয়ে তার অন্যরকম পক্ষপাতদুষ্টতা ছিল।

মুনিয়ার লাশ নামানো নিয়েও চার ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন নুসরাত। কখনো তিনি বলেছেন লাশ ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেছেন, কখনো বলছেন তিনি লাশ দেখেছেন খাটে শোয়ানো অবস্থায়। আইন প্রয়েগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, মুনিয়া মারা গেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার বোনের ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের ঘটনায় প্রকৃত তথ্য আড়াল করার উদ্দেশ্যটি প্রকাশ পায়।

এই বাড়িটি নুসরাতের নামে ভাড়া করা এবং এই বাড়িওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং অ্যডভান্সের ২ লাখ টাকা নুসরাতই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার স্বামী স্ত্রী এবং ছোট বোনকে নিয়ে এখানে থাকবেন। এই বাড়িটি যে তার নামে ভাড়া ছিলো এ নিয়ে নুসরাত অনেক বিভ্রান্তি করেছেন। নুসরাত যে বাড়ির মূল ভাড়াটে ছিলেন সেই তথ্যটি তিনি গোপন করেছিলেন। পুরো মামলাটিতে দেখা যায় যে আলামত বের হওয়ার আগেই একজনকে অভিযুক্ত করা এবং টার্গেট করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। নুসরাত কি তাহলে অন্য কারও ইন্ধনে বা কাউকে খুশি করতে এই মামলা করেছেন এই প্রশ্ন এখন তদন্ত সামনে চলে আসছে। কারণ হুইপ পুত্র শারুনের সঙ্গে মুনিয়ার সম্পর্ক অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পুলিশ পেয়েছে। নুসরাতের সঙ্গে শারুনের লেনদেন ছিল কিনা তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি