মঙ্গলবার, ১৮ মে, 2০২1
শেখ হাসিনাকে লেখা ডা. জাফরুল্লাহর খোলা চিঠি প্রসঙ্গে
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 26 April, 2021 at 7:59 PM

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ দেশে করোনা মহামারি দমনের ১১টি প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। ডা. জাফরুল্লাহ দেশের একজন বর্ষীয়ান চিকিৎসক এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞও। একই সঙ্গে তিনি রাজনীতিবিদও। সাধারণে তিনি বিএনপির অভিভাবক হিসাবেও পরিচিত। বিএনপি নেতারা দেশের এ ভয়াবহ দুর্যোগের সময় যখন দুর্গত মানুষের মনে কোনো আশার বাণী না শুনিয়ে পরিস্থিতি থেকে নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ উদ্ধার এবং ভারত বিরোধিতার পুরোনো নীতি অনুসরণে ব্যস্ত রয়েছেন, তখন বিএনপির একজন উপদেষ্টা হয়ে তিনি কয়েকটি গঠনমূলক প্রস্তাব নিয়ে সরকারের কাছে এগিয়ে এসেছেন, এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতে হয়।
ডা. জাফরুল্লাহকে জাতি শ্রদ্ধা করে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেও তার একটি স্মরণীয় ভূমিকা ছিল। বিএনপির চরিত্রস্খলন এবং পরবর্তীকালে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সব প্রবীণ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করার পরও তিনি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বজায় রেখেছেন। এটা তার ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। যেটা তার কাছ থেকে আশা করা গিয়েছিল, তিনি বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী ভূমিকা গ্রহণের বিরোধিতা করবেন এবং প্রতিটি জাতীয় সংকটে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করবেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে বিশপ টুটু জাতীয় অভিভাবকের অদলীয় বিশাল ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার স্থপতি নেলসন ম্যান্ডেলাকেও তার ব্যক্তিগত চরিত্র সংশোধনের জন্য উপদেশ দিতে দ্বিধা করেননি। তেমনি একজন জাতীয় অভিভাবক বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ শুধু দলগতভাবে নয়, সামাজিকভাবেও ভীষণভাবে বিভক্ত এবং রাজনীতি ও নীতির পরিবর্তে পারস্পরিক বিদ্বেষে পূর্ণ। এসময় বিশপ টুটুর মতো একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক জাতীয় অভিভাবকের খুব বেশি প্রয়োজন ছিল।
এ প্রয়োজন পূরণে প্রবীণ ব্যক্তিত্বের অভাব ছিল না দেশে। এ ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন ও ডা. জাফরুল্লাহসহ বেশ কয়েকজনেরই নাম উল্লেখ করা যায়। কিন্তু জাতীয় অভিভাবকের গুরু দায়িত্বটি পালনে এগিয়ে এলেন না তারা। সবাই ক্ষমতার লোভ এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের আবর্তে তলিয়ে গেলেন। তবু ভালো, বঙ্গবন্ধু ও আমাদের জাতীয় নেতাদের হত্যার পর শেখ হাসিনা অসীম সাহস ও ধৈর্য দেখিয়ে তার নেতৃত্বকে একটি জাতীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে গড়ে তুলেছেন। তার ফলে অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে এবং রাজনীতিতেও গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে।
এ সরকারের ভুলভ্রান্তি কিছু নেই তা বলা যাবে না। ব্যর্থতা কিছু নেই, তা-ও বলা যাবে না। পশ্চিমা গণতন্ত্রের দাঁড়িপাল্লায় মাপলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রেরও কিছু সমস্যা আছে। কিন্তু এই সময় এ সরকারই বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত সরকার। এ সরকারের বিকল্প সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধতার মধ্যযুগীয় সরকার। কোনো সুস্থ মানুষ তা চাইতে পারেন না। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দেয়নি। রাজনীতিকরা অনভিজ্ঞ এবং আমলারা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এমন একটি দেশে করোনার বর্তমান ব্যবস্থাপনার চেয়ে ভালো ব্যবস্থাপনা আশা করা যায় না। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি ভালো এবং করোনা মোকাবিলা করার ব্যবস্থাপনাও ভালো।
এ অবস্থায় ডা. জাফরুল্লাহ করোনা মোকাবিলার জন্য ১১ দফা প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। ভালো হতো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে যদি প্রস্তাবগুলো তৈরি হতো এবং বলা হতো এটা কী করোনা মোকাবিলার আশু কর্মসূচি, না করোনা প্রতিরোধ এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা। আবার এ ১১ দফা পরিকল্পনা সূক্ষ্ম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যবর্জিত নয়। অনেক ভালো প্রস্তাবের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রস্তাবটি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায়নি। সে কথায় পরে আসছি।
ডা. জাফরুল্লাহর প্রস্তাবগুলোর বিশেষজ্ঞ সুলভ আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। কারণ তার মতো আমি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ অথবা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নই। তাই এ প্রস্তাব নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা আমার জন্য ধৃষ্টতা। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নিয়ে দেখা হলেও বুঝতে বাকি থাকে না, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকারের দীর্ঘ সময় এবং বিস্তর অর্থের প্রয়োজন হবে। কথায় বলে ‘বন্ধুর বাড়িতে জেয়াফত, আমি হলাম খাদিমদার’। ডাক্তার সাহেব তো রোগীর হাতে এমন প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিলেন, যার ওষুধ কিনতে বিশাল অর্থের প্রয়োজন। যা কোথায় পাওয়া যাবে ডাক্তার সাহেব তা বলেননি।
এ ১১ দফা প্রস্তাবের মধ্যে আমার মতো আনাড়ি চোখেই দেখা যায়, কিছু অপ্রয়োজনীয় প্রস্তাব আছে। বাকি প্রস্তাবগুলো প্রয়োজনীয়, তবে তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় ও বিরাট অর্থের প্রয়োজন। যে দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা দৈনিক একশ’ ছাড়িয়ে গেছে, হাসপাতালে বেড নেই, আগে সেখানে এ সমস্যাগুলোর সমাধান করে রোগীর প্রাণ বাঁচানোর আশু ব্যবস্থা করা দরকার। করোনা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পরে হাত দিলেও চলবে। ভারত এখন করোনা সমস্যায় ভীষণভাবে জর্জরিত। লন্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ এজন্য মোদির কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন ও অন্ধবিশ্বাসকে দায়ী করেছেন (দেখুন গার্ডিয়ানের ২৪ এপ্রিল শনিবারের লিড এডিটোরিয়াল-‘গড়ফর'ং ড়াবৎপড়হভরফবহপব ষরবং নবযরহফ ঃযব ফরংধংঃৎড়ঁং ওহফরধহ ঢ়ধহফবসরপ ৎবংঢ়ড়হং). গার্ডিয়ান বলেছে, হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার এ ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো তিনি একচোখা নীতি গ্রহণ করেছিলেন যে, ভারতের মানুষকে করোনা তেমন আক্রমণ করবে না। সেজন্য তার সরকার এ ভয়ানক অবস্থার মধ্যে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দিয়েছে এবং লাখ লাখ নর-নারীকে কুম্ভমেলা পালনে গঙ্গায় ডুব দিতে দিয়েছে। গার্ডিয়ান আরও লিখেছে, পশ্চিমা দেশগুলো চেয়েছিল ভারত করোনার টিকা তৈরিতে এগিয়ে যাক। এজন্য তারা সাহায্য ও সহযোগিতাও দিয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকার তাতে নজর দেয়নি। তার নজর ছিল নির্বাচন প্রোপাগান্ডার দিকে। ফলে আমেরিকা ও চীন এ টিকা তৈরিতে ভারতকে পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে গেছে। জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মারকেল বলেছেন, ভারতের ওপর নির্ভর করা পাশ্চাত্যের জন্য ভুল হয়েছিল। বাংলাদেশে বিএনপির নীতি করোনা সমস্যাকে রাজনৈতিক ফায়দা উঠানের কাজে ব্যবহার করা, জনগণের প্রাণ রক্ষা নয়। সরকার জনগণের প্রাণরক্ষার জন্য লকডাউন দিয়েছিল। হেফাজতের বাবুনগরী তার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, হেফাজতিদের ধরার জন্য সরকার লকডাউন দিয়েছে। একই কথা বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে। সরকার যে লকডাউন ঘোষণা করেছিল, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, সরকারের লকডাউন ঘোষণা করার উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে ধ্বংস করা। জানতে ইচ্ছা করে, হেফাজতিদের সঙ্গে কি বিএনপি নেতাদের কালেক্টিভ ম্যাডনেসে পেয়েছে?
মির্জা ফখরুল ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ করারও প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা বিএনপি নেতাদের চিরকালের ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের প্রমাণ। যেখানে ট্রাম্প সীমান্তে ইটের দেওয়াল তুলে, সীমান্তরক্ষীদের দ্বারা বর্বর অত্যাচার চালিয়ে মেক্সিকান ইমিগ্রান্টদের আমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করতে পারেননি, সেখানে তিনদিকের উন্মুক্ত সীমান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ভারত থেকে কারও বাংলাদেশে আগমন বন্ধ করা কি সম্ভব? যেটা সম্ভব তা হলো, ভারত থেকে রোগাক্রান্ত রোগী যাতে বাংলাদেশে না আসে এবং বাংলাদেশ থেকে এরকম রোগাক্রান্ত কেউ ভারতে না যায়, এর ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ সরকার সেই ব্যবস্থা যথাসম্ভব করেছে। বিএনপির মতো আওয়ামী লীগের অযথা ভারতবিদ্বেষ নেই।
এবার বিএনপির অভিভাবক ডা. জাফরুল্লাহর ১১ দফা প্রস্তাবের একটি প্রস্তাবের কথায় আসি। এক ভাঁড় দুধে এক ফোঁটা গো-চনা পড়লে যেমন দুধ নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি ডা. জাফরুল্লাহর ১১ দফার এত ভালো ভালো প্রস্তাবের সব পবিত্রতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং উদ্দেশ্য ধরা পড়ে গেছে এ একটি প্রস্তাবে। প্রস্তাবটি হলো, ‘ট্রিপসের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন বা টিকা উৎপাদনে সুবিধা সৃষ্টির জন্য নোবেলজয়ী ড. ইউনূসকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত নিযুক্ত করে ইউরোপে পাঠানো।’ শাক দিয়ে ঢাকা মাছ এবার ধরা পড়েছে। ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকঘটিত কেলেঙ্কারির পর তার আগের সুনাম নেই, খ্যাতিও নেই। বর্তমানে তিনি প্রায় বিস্মৃত ব্যক্তি। তার হাসিনাবিদ্বেষ, বিশেষ করে এক-এগারোর সরকার গঠনের পেছনে তার ভূমিকা, হাসিনা নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য এক-এগারোর সরকার গঠনের সময় তাদের সাহায্য নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা, সর্বোপরি পদ্মা সেতু পরিকল্পনার মতো বিশাল জাতীয় স্বার্থের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার জন্য বিশ্বব্যাংকে তার প্রভাববিস্তারের অভিযোগ জানাজানির পর কোনো জাতীয় স্বার্থ পূরণের কাজে কি ড. ইউনূসকে বিশ্বাস করা যায়? শেখ হাসিনা তাকে বিশ্বাস করবেন কীভাবে? আর ড. ইউনূসই বা এত সব ঘটনার পর শেখ হাসিনার দূত হবেন কোন মুখে? ডা. জাফরুল্লাহর কি এটা একজন বিস্মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে জাতীয় জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠাদানের কোনো গোপন পরিকল্পনা? ড. ইউনূসের কি এ পরিকল্পনায় সম্মতি আছে, তা জানতে ইচ্ছা করে। আর করোনা সমস্যায় ড. ইউনূসকে ইউরোপে শেখ হাসিনার বিশেষ দূত করে পাঠিয়ে লাভটা হবে কী? বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য শেখ হাসিনার বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে অনুরোধ জানানোই যথেষ্ট। ড. ইউনূসের অনুরোধ সেখানে বেশি গুরুত্ব পাবে না। ডা. জাফরুল্লাহর কাছে আমার একটাই অনুরোধ। এরশাদের আমলে তিনি সরকারের ওষুধ নীতিনির্ধারণের নামে নিজের উদ্দেশ্য ও স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে দেশে ওষুধ আমদানি ব্যবস্থায় গুরুতর বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিলেন। আর নতুন বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করবেন না। আওয়ামী লীগ সরকারকে তিনি ভালো প্রস্তাব, উপদেশ দিলে ভালো। কিন্তু তা যেন উদ্দেশ্যমূলক না হয়।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি