মঙ্গলবার, ১৮ মে, 2০২1
করোনার ছোবল এবং খালেদা জিয়া
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 17 April, 2021 at 7:38 PM

বুধবার পহেলা বৈশাখ ১৪২৮ সাল। লন্ডনে খুবই একটা সুন্দর দিন। সোনালি সকাল ঝলমল করছে। করোনার আক্রমণও লন্ডনে তেমন নেই। তবু মনটা তো তেমন ভালো ছিল না। আগের দিন ৩১ চৈত্র বাংলাদেশ থেকে একটা খারাপ খবর পেয়েছি। রবীন্দ্রসংগীতের খ্যাতনামা শিল্পী মিতা হক আর নেই। করোনা তাকে নিয়ে গেছে। এমন মিষ্টি কণ্ঠের অধিকারী মিতার জুড়ি আর নেই। আমার কাছে ছিল নিজের মেয়ের মতো। গোটা পরিবারের সঙ্গেই আমার ছিল ঘনিষ্ঠতা। মিতার সঙ্গে তো ছিলই। বিলাতে এলে আমার বাড়িতে গান শোনাত। ঢাকার রবীন্দ্রসংগীতের সফল শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, অদিতি মহসিন, লিমা হক সবার সঙ্গেই আমার পরিচিতি আছে, যেহেতু রবীন্দ্রসংগীত ভালোবাসি, সেহেতু এদেরও ভালোবাসি। মিতার আকস্মিক মৃত্যু এই ভালোবাসায় একটা হাহাকার এসেছে।
তবু পহেলা বৈশাখের সুন্দর দিন, উৎসবের আবহাওয়া মনটাকে একটু শান্ত করে আনছিল, এমন সময়ে এলো আরও দুটি মৃত্যুর খবর। বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক এবং বর্তমান সভাপতি শামসুজ্জামান খান এবং আমাদের সাবেক আইনমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের সদ্যনির্বাচিত সভাপতি আবদুল মতিন খসরু করোনার শিকার হয়েছেন। মন থেকে পহেলা বৈশাখের সব আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হলো। যিনি খবর দিচ্ছিলেন তাকে ঔৎসুক্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বদরুদ্দীন উমরের খবর কি? এই বামপন্থি প-িত এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচয়িতা দু'দিন আগেই করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে শুনেছিলাম। তার অবস্থাও খুব ভালো নয়।
পরদিন দোসরা বৈশাখ বৃহস্পতিবার আরও অনেক খবর পেলাম। ওয়ার্কার্স পার্টির তরুণ নেতা রাজশাহীর এমপি ফজলে হোসেন বাদশা গুরুতরভাবে রোগাক্রান্ত, রোগটা করোনা। তাকে চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়েছে। আরও দু-একজন পরিচিতজনের করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর পেলাম, তাদের মধ্যে আছেন কবরী সরোয়ার। অভিনেত্রী এবং সাবেক এমপি। কিছুকাল আগে তার লেখা 'আত্মজীবনী' আমাকে পাঠিয়েছেন। সম্ভবত সুভাষ দত্ত তাকে অভিনয় জগতে টেনে এনেছিলেন। তখন ঢাকার বাংলা সিনেমা হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটছে। তাকে যারা হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, কবরী সরোয়ার তাদের একজন।
মনে হয় এই উদ্দাম মৃত্যুসাগরে নিজেও বেঁচে থাকব না। কবে যাব শুধু সেটাই জানা নেই। সবশেষে খবর এলো বিএনপি নেত্রী এবং দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তাকে বৃহস্পতিবার শারীরিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। খোদা না করুন, যদি তার কিছু হয় তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরাট শূন্যতা নেমে আসবে। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হবে না। বিরোধী দলের নেত্রী বলতে খালেদা জিয়া তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। তার স্থানটি আজ পর্যন্ত কেউ পূর্ণ করতে পারেনি। তাই আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি, খালেদা জিয়া যেন অবিলম্বে সুস্থ হয়ে ওঠেন। জেলে থাকুন আর জেলের বাইরে থাকুন, যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার আসনটি শূন্য হতে না দেন। তার রাজনীতির সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি না।
কিন্তু তার সাহসের প্রশংসা করি। তিনি না থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতি শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ একজন সাহসী নেত্রীকে পেত না। বিএনপির ঐক্য এবং অস্তিত্ব থাকত না। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর জাস্টিস সাত্তার কিছুদিন ক্ষমতায় ছিলেন বটে, কিন্তু শাহ আজিজ বিদ্রোহী হয়ে পাল্টা বিএনপি খাড়া করেছিলেন। জাস্টিস সাত্তার প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু তার মন্ত্রীরা কেউ তার কথা শুনতেন না। শাহ আজিজের সঙ্গে প্রথমে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের, তারপর শাহ আজিজ মারা যেতেই মওদুদ ও কাজী জাফরের ঝগড়া লেগেই ছিল। খালেদা জিয়া তখনও রাজনীতিতে আসেননি। জাস্টিস সাত্তারের  নেতৃত্বে বিএনপি কোনো ঐক্যবদ্ধ দল ছিল না। জাস্টিস সাত্তারের না ছিল ব্যক্তিত্ব, না ছিল নেতৃত্বদানের  ক্ষমতা ও যোগ্যতা।
সেনাপতি এরশাদের ক্ষমতা দখলে তখন কোনো রক্তাক্ত ক্যু ঘটাতে হয়নি। এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর তাকে মেরে ফেলতে পারেন এই ভয়ে জাস্টিস সাত্তার এরশাদ দেশের ক্ষমতা দখল করতে চলেছেন, এই খবর শুনেই অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে গিয়ে আশ্রয় নেন। ডাক্তারদের কাছে কাতর অনুরোধ জানাতেন, তারা যেন তার প্রাণ বাঁচান। এরশাদ ব্যক্তিত্বহীন ও ভীরু জাস্টিস সাত্তারকে ক্ষমতা দখলের জন্য হত্যা করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। তিনি হাসপাতালে গিয়ে সাত্তারের সঙ্গে দেখা করেন এবং সাত্তার তার প্রতি আনুগত্য জানান। এরশাদের নির্দেশেই জাস্টিস সাত্তার নিজের মন্ত্রিসভার সদস্যদের অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ বলে তার শেষ বেতার ও টেলিভিশন বক্তৃতায় ঘোষণা করেন। এরশাদের রক্তপাতহীন ক্ষমতা দখলের পথ জাস্টিস সাত্তারই সহজ করে দেন। এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর তাকে 'নিশানে পাকিস্তান' খেতাব দিয়েও পাকিস্তানের সামরিক ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস নিশ্চিত থাকতে পারেনি, এরশাদ সাহেব পাকিস্তানের প্রতি কতটা অনুগত থাকবেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে কিছুটা বিলম্বে এরশাদ বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং নানা তদবির করে ভারতের দেরাদুনে সামরিক উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য যান। পাকিস্তানের সামরিক সংস্থা তাতে উদ্বিগ্ন হয় এবং বিএনপিকে টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর বেগম জিয়া রাজনীতিতে না আসার সিদ্ধান্ত নিলেও এবার তাকে রাজনীতিতে নামতে এবং বিএনপির নেতৃত্ব নিতে রাজি হতে হয়। এই নেতৃত্ব গ্রহণে প্রথমে তিনি সাহসের পরিচয় দেন এবং পরে যোগ্যতা অর্জন করেন। তিনি স্বশিক্ষিত নারী।
প্রথমবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি সংসদে বক্তৃতা করতে পারতেন না, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সদস্যদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতেও জানতেন না। এ জন্য তিনি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতেন দলের উপনেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ওপর। সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো বক্তব্য রাখতে হলে বা সদস্যদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে হলে প্রধানমন্ত্রীর হয়ে কথা বলতেন, প্রশ্নের জবাব দিতেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এ জন্য তাকে বিএনপির সংসদীয় উপনেতা করা হয়েছিল এবং সংসদে তিনি এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাম পাশে বসতেন এবং দেখা যেত তিনি বিএনপির ক্ষমতায় থাকার প্রথমদিকে সংসদে বসে প্রায়শ বেগম খালেদা জিয়ার কানে কানে কথা বলতেন। অর্থাৎ তাকে পরামর্শ দিতেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় রীতিনীতি, বক্তৃতা দেওয়া, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শিখে ফেলেছিলেন। রাজনৈতিক নেতা হওয়ার গুণ তিনি দ্রুত আয়ত্ত করেন। সাহস ও ব্যক্তিত্ব তাকে অর্জন করতে হয়নি। এটা তার চরিত্রেই ছিল। তিনি দলের নেত্রী হওয়ার পর বিএনপিতে ঐক্য ফিরে আসে। ব্যারিস্টার মওদুদ ও মান্নান ভূঁইয়াসহ দলের তাবৎ যত নেতা তাকে ভয় করে চলতেন। এখনকার দল-নেতারা তো তার সামনে কথা বলতেই ভয় পান।
এই সাহস ও ব্যক্তিত্বের জন্যই বেগম খালেদা জিয়াকে বাহবা দিই। এক-এগারোর শাসনের সময় তিনি এই সাহসের প্রমাণও দিয়েছেন। তারেক রহমান শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও সাহস কোনোটাই অর্জন করতে পারেননি। তাকে আধা সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার নানা দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার করতেই তিনি ভেঙে পড়েন এবং নিজের সব দোষ কবুল করে তৎকালীন সরকারকে আর রাজনীতি না করার মুচলেকা সই করে দিয়ে সপরিবারে জামিনে লন্ডনে চলে যান। আজ দশ-বারো বছরের মধ্যে দেশে ফেরার সাহস তার হয়নি। দেশে ফিরে সব মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলা করে, দরকার হলে জেলে গিয়ে জেলে বসে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা ও তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস তিনি দেখাননি। অন্যদিকে খালেদা জিয়া শুধু এবার নয়, সেই এক-এগারোর আধা সামরিক সরকারের আমলে গ্রেপ্তারবরণ করে সাবজেলে ছিলেন এবং দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও যাননি। তার ইচ্ছাতেই সৌদি সরকার তার ভিসায় ত্রুটি দেখায় এবং বেগম জিয়াও দেশ ছাড়তে অসম্মত হন। শোনা যায়, সৌদি আরব সরকার বেগম জিয়ার জন্য রিয়াদে উগান্ডার ইদি আমিনের পরিত্যক্ত বাড়িটি মেরামত করে প্রস্তুত রেখেছিল। কিন্তু বেগম জিয়া দেশ ছাড়েননি। ফলে তার নেতৃত্ব বেঁচে গেছে। দল বেঁচেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত দ্বিতীয় প্রধান দল হয়ে উঠতে পারেনি। আমি বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘজীবন কামনা করি। তার করোনামুক্তি, সর্বপ্রকার রোগমুক্তি চাই। তিনি যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন বিএনপি টিকে থাকবে। শত ভাঙাগড়া সত্ত্বেও টিকে থাকবে। বিএনপি যদি না থাকে তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির স্থান দখল করবে জামায়াত অথবা হেফাজত। সেই অভিশপ্ত দিন আমি কল্পনা করি না। দেখতেও চাই না। আমি চাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক একটি দ্বিতীয় বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দল গড়ে না ওঠা পর্যন্ত বিএনপি টিকে থাকুক, বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকুন।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি