মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল, 2০২1
মোদির সফর এবং হেফাজতি হুমকি
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 28 March, 2021 at 7:32 PM

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। গতকাল (শনিবার) চলে গেলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশের আরো কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানও আমন্ত্রিত হয়ে ঢাকা এসেছিলেন। মোদি শুধু ঢাকা সফর করেননি, বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জও সফর করেছেন। জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনও করেছেন। বাংলাদেশ এবং হাসিনা সরকারের প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর যে সহানুভূতি ও সমর্থন আছে তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশে আবার কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে তিনিও সফর বাতিল করেননি।
হাসিনা সরকার কর্তৃক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ পালন এই সরকারের এক বিরাট সাফল্য। ভারতসহ নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও অন্যান্য সরকারপ্রধানের যেমন অনুষ্ঠানে এসেছেন, তেমনি চীনসহ বিশ্বের অধিকাংশ ছোট-বড় দেশ (পশ্চিমা দেশগুলোও) এবার ঢাকায় অকুণ্ঠভাবে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন পাঠিয়েছে। ২০২০ থেকে সারা বছর করোনার দুর্দৈবের মধ্যেও সাফল্যজনকভাবে মুজিববর্ষ পালন সরকারের বিরাট সাফল্যের প্রমাণ। এই মুজিববর্ষ পালনে সরকার জনগণের সমর্থনও পেয়েছেন।
মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল করেনি। করেছে হেফাজত। এই সংগঠনের সাবেক নেতা আল্লামা শফীর আমলে হেফাজত বলেছে, তারা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। ধর্মের প্রচার ও সংরক্ষণ তাদের লক্ষ্য। এখন আল্লামা শফীর মৃত্যুতেই হেফাজতের নতুন নেতা বাবুনগরী ও মমিনুল হকের আমলে দেখা যাচ্ছে, হেফাজত দেশে রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারিতে গোলযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার স্পষ্টভাবে বলেছেন, নরেন্দ্র মোদিকে বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দলের নেতা হিসেবে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ। এই দেশের সঙ্গে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনার জন্য মোদি এবং তার সরকারের সঙ্গেই আমাদের বসতে হয়। সেই সরকারের প্রধানকে এড়িয়ে চলা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু ভারতের বর্তমান সরকার নন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের প্রতি তার আন্তরিক মিত্রতার প্রমাণ দিয়েছেন। স্থল সীমান্ত, ছিটমহল সমস্যাসহ সব সমস্যা তিনি মীমাংসা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বাগড়া না দিলে তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানির সমস্যারও সুরাহা হয়ে যেত। তবু মোদি আশ্বাস দিয়েছেন, যত শিগিগর সম্ভব, তার সরকার তিস্তা সমস্যারও সমাধান করবেন। মোদি এই ভয়াবহ করোনা সমস্যার সময়ে বাংলাদেশের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। যথাসময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ করোনার ভ্যাকসিন না পাঠালে বাংলাদেশ সমস্যায় পড়ত। বাংলাদেশের প্রতি মিত্রতার প্রমাণস্বরূপ তিনি দফায় দফায় বিনা মূল্যে করোনার ভ্যাকসিনও দিয়েছেন। শুধু নদীর পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নয়, আরো বহু বিষয়ে আমরা ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাই নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময়—তাও আবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিবসে, গোলযোগ সৃষ্টি করা কোনো দল বা গ্রুপের পক্ষে উচিত হয়েছে কি? এখন প্রশ্ন, মোদি সরকার ভারতে যেভাবে সংখ্যালঘু দমন করছেন, কাশ্মীরে অত্যাচার চালাচ্ছেন, তাতে বাংলাদেশের মানুষ কি প্রতিবাদ জানাবে না? অবশ্যই জানাবেন। সেটা বাংলাদেশের যে কোনো রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিবসটি এড়ানো এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন শন্তিপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল। হাটহাজারীতে যে গোলযোগ হেফাজতিরা করেছেন তা মোটেই শান্তিপূর্ণ ছিল না। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে জেনেছি, হেফাজতিরা এমন ভয়ানকভাবে হাটহাজারি থানা আক্রমণ করেছিল, যাতে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পুলিশের গুলিবর্ষণ ছাড়া উপায় ছিল না। হাটহাজারি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মোদির ঢাকা সফরের প্রতিবাদ জানানো হেফাজতিদের মূল লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল দেশময় গোলযোগ সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানো। এই লক্ষ্য হাসিলের জন্য বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর তো তারা করেছেন, আবার বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা করেছেন। সরকার শক্ত হাতে এই গোলযোগ দমন করেছে। গোলযোগ অব্যাহত রাখা হলে সরকারও চুপ থাকবে না। হেফাজতের এই গোলযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টায় একটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয়। কোথাও হেফাজতিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়নি। মোদির বাংলা সফরের প্রতিবাদ জানায়নি একটি রাজনৈতিক দলও। এমনকি বিএনপি, জামায়াতও প্রতিবাদ জানায়নি। মাঠে নেমেছে হেফাজত এবং বাম বলে কথিত এক বা একাধিক ক্ষুদ্র ছাত্রগোষ্ঠী। বিএনপি-জামায়াত কী করে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের প্রতিবাদ জানাবে? মোদি এবং বিজেপি যখন নির্বাচনে জিতে দিল্লিতে ক্ষমতায় আসেন, তখন বিএনপি ও জামায়াত আনন্দে গদগদ হয়ে ঢাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছিল। এখন কোন লজ্জায় তারা নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ জানাবেন? তাছাড়া তারেক-মির্জা ফখরুলেরা এখনো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মোদির কৃপার জন্য বর্ষার চাতক পাখির মতো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে বসে আছেন।
গোলযোগ দমনে পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে হেফাজত দেশময় হরতাল ডেকেছে। এই সময়েই দেখা যাবে হেফাজতের পেছনে জনসমর্থন কতটুকু আছে? আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এতদিনে হেফাজতিদের নাম উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘হেফাজতিদের ডাকা হরতাল সফল হতে দেওয়া হবে না।’ যাক, এতদিনে বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখে হেফাজতের বিরুদ্ধে হুংকার শোনা গেল। ভাদ্র বৌয়ের মুখে অবশেষে ভাশুরের নাম। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনার সময় থেকেই আমি লিখে আসছি জামায়াত ও হেফাজতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। জামায়াতকে দমনের জন্য হেফাজতকে পুষলে জামায়াতকেই পোষণ করা হবে। এই হেফাজতি তোষণের নীতি ব্যাঙাচিকে ব্যাঙ হওয়ার পথ সহজ করে দেবে। তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ক্ষতি করার সময়েই। সরকার এখনো সতর্ক হননি। এখন তার খেসারত সরকারকেই দিতে হবে। হাটহাজারিতে শেষ পর্যন্ত চার জন হেফাজতিকে গুলি করে মেরে সরকারকে দুর্নাম নিতে হলো।
অবশ্যই হেফাজতের ডাকে জনগণ হরতালে সমর্থন দেবে না। কিন্তু দেশে ছোটখাটো গোলযোগ হবে। যেমন হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের ডাকা কয়েক বছর আগের আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার আন্দোলনে। হেফাজতিদের যে আন্দোলন করার শক্তি ও সাহস নেই তা ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরেই প্রমাণিত হয়েছে। এবার যে তারা ‘মর্দে মুমিন’ সাজার সাহস দেখাচ্ছেন তার কারণ এই আন্দোলনে হেফাজতিদের সাইনবোর্ড রয়েছে। এই সাইনবোর্ডের আড়ালে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে নেমেছে বিএনপি ও জামায়াত। বিড়াল যেমন দুধ চুরি করে দ্রুত গোঁফ মোছে, তেমনি মোদির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ জানানোর সাহস ও ইচ্ছা কোনোটাই বিএনপির নেই। ভারতকে তারা চটাতে চায় না। তাই হেফাজতিদের বোরকা পরে তাদের এই খেলা। কিন্তু বিড়ালের গোঁফে যে দুধ লেগে গেছে সেই খেয়াল মির্জা ফখরুলদের নেই।
 ছাত্রদল মাঠে নামায় তা ধরা পড়ে গেছে। বাবুনগরী, মমিনুল হক গংদের মঞ্চে নামানো হয়েছে মাত্র। পেছনে আসল সুতা বিএনপি-জামায়াতের হাতে। সরকার কঠোর হোন। নইলে সরকারকে অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর জন্য আবার আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার সন্ত্রাসের মতো সন্ত্রাস শুরু করার চেষ্টা হবে। সরকার অতীত থেকে যদি শিক্ষা নিয়ে থাকেন, তাহলে হেফাজতি হুমকিতে তাদের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দয়া করে হেফাজতিদের দিকে আবার যেন তারা আপসের হাত না বাড়ান।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি