শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০
কলামিস্ট রোবটের কাছে মানুষ হেরে যাবে?
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 24 October, 2020 at 8:07 PM

কয়েক বছর আগে জাপানে কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম। গিয়ে পরিচিত হয়েছিলাম তখন জাপানেই ছাত্র হিসেবে আছেন বাংলাদেশের ড. মামুন ইকবালের সঙ্গে। তিনি এখন জাপানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিটেকচারে ডক্টরেট করছেন। তিনি জাপানের টেলিভিশনের বাংলা বিভাগে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন। তিনি আমাকে একটা বাংলা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য ওই টেলিভিশন কেন্দ্র নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকজন হাসিখুশি মুখ জাপানি তরুণী ছিলেন। তারা শান্তিনিকেতনে গিয়ে চমৎকার বাংলা শিখে এসেছেন। তাদের একজনকে ঠাট্টা করে বললাম, আপনি যখন বাংলা শিখেছেন, তখন একজন বাঙালি বর আপনাকে দিতে হবে। তিনি তেমনি ঠাট্টার সুরে বলেছিলেন, আপনিই তাহলে খুঁজে দিন।
এসব বাহুল্য কথা। আসল কথায় আসি। লন্ডনে থাকতেই সম্পূর্ণ মানুষের আদলে যান্ত্রিক রোবট তৈরির কথা জেনেছিলাম। রোবট মানুষের ভাষা বোঝে। মানুষের আজ্ঞা পালন করে। তবে মানুষের মতো সব কথা বলতে পারে না। তদুপরি তার যান্ত্রিক হার্টে মানুষের মতো কোনো অনুভূতি নেই। তখন জাপানেই রোবট বানানোর ইন্ডাস্ট্রি এগিয়েছিল বলে সেদিন জাপানি তরুণীদের সঙ্গে রোবট সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। জানলাম তখনই কোনো কোনো ধনী মানুষের ঘরে রোবট গৃহভৃত্যের দায়িত্ব সীমিতভাবে পালন করে।

তারপর বহুদিন গেছে। রোবট নিয়ে বহু খবর সংবাদপত্রে পড়েছি। রোবট ইন্ডাস্ট্রিতে এখন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে। রোবট নিয়ে তৈরি অনেক ছায়াছবি দেখেছি। রোবটকে এখন ভাষাশিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। তাকে বড় বড় রেস্টুরেন্ট ও পাবে রিসেপশনিস্ট এবং ওয়েটারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রোবট রেস্টুরেন্টের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অতিথিদের ওয়েলকাম জানায় এবং খাবার পরিবেশন করে যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের মতো দেশে। সে খবরও সংবাদপত্রে পাঠ করেছি।

ছায়াছবিতে দেখানো হয়েছে, রোবটের মনে মানুষের মতো প্রেম-ভালোবাসার অনুভূতি। একটি হলিউডি ছবিতেই দেখেছি এক রোবট তার মালিক এক তরুণীর প্রেমে পড়ে। তরুণী তাতে সাড়া না দেওয়ায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে হত্যা করে। বাস্তবে অবশ্য এটা ঘটেনি। ভবিষ্যতে ঘটবে কিনা বিজ্ঞানীরা এখনও তা বলতে পারেন না। তিন-চার বছর আগে লন্ডনের কাগজেই একটা খবর পড়ি, রোবটকে দিয়ে সম্পাদকীয় এবং উপসম্পাদকীয় লেখানো সম্ভব হবে। খবরটা পড়ে একটু ভয় পেয়েছিলাম। তাহলে আমরা যারা সংবাদপত্রে সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় লিখি, রোবট কি তাদের ভাত মারবে? খবরে বলা হয়েছিল, রোবটের জন্য যে কোনো বিষয়ে ডাটা ইত্যাদি সেট করে দিলে সে চমৎকার সম্পাদকীয় অথবা উপসম্পাদকীয় লিখতে পারবে। আমার মতো অনেকের মনেই তখন হয়তো সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় লেখার মতো কাজ যদি রোবটকে দিয়ে করানো যায় অর্থাৎ রোবটের মস্তিস্ক কাজ করে, তাহলে তার হৃদয় কেন একদিন কাজ করবে না। তার মধ্যে প্রজননক্ষমতাও দেখা দেবে। পৃথিবীতে এমনিতেই আশঙ্কাজনক হারে লোকসংখ্যা বাড়ছে। এবার রোবট-মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করবে।

যাহোক এসব তো ভবিষ্যতের কথা। ঘটবে কি ঘটবে না আমাদের জানা নেই। কিন্তু এটা সত্য, রোবট এখন মানুষের অনেক কাজ কেড়ে নিয়েছে। গৃহভৃত্য, দারোয়ান, অফিসের রিসেপশনিস্ট, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের ওয়েটার ইত্যাদি। রোবট এখন সীমিত সংখ্যক তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে ব্যাপক হারে কমার্শিয়ালি তৈরি হলে বিরাট সংখ্যক মানুষ চাকরি হারাবে, বেকার হবে। ইতোমধ্যেই রোবট গাড়ি, বাস, ট্রেন চালাবে; বিমানের পাইলট হবে- এমন কথা বলা হচ্ছে। তা যদি হয়, কী হারে মানুষ বেকার হবে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না।

যন্ত্রশক্তি যখন আবিস্কৃত হয়, তখন মানুষ খুশি হয়েছিল। তাদের কায়িক শ্রম করা থেকে মুক্তিলাভ ঘটবে। কাপড় কাচা থেকে রান্নাবান্না সবই মেশিনে করা সম্ভব, এটা কি মানুষের কম স্বস্তি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে দেখা গেল এই যন্ত্রশক্তির জোরে ক্যাপিটালিস্টরা শ্রমিকদের চাকরি থেকে বরখাস্ত, শ্রমিক আন্দোলন দমন ইত্যাদি করছে। পৃথিবীতে বেকারের সংখ্যা বিশালভাবে বেড়ে যাচ্ছে। আগে শ্রমিকরা একজোট হয়ে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে দাবি আদায় করত, এখন তাও পাবে না। কারণ, তাদের প্রয়োজন নেই। মালিকের হাতে আছে যান্ত্রিক শ্রমশক্তি।
এই বিষয়টি আরও ভালোভাবে স্পষ্ট হলো লন্ডনের বিখ্যাত টাইমস পত্রিকায় প্রেস শ্রমিকদের ধর্মঘটের সময়। ইন্টারনেট আবিস্কৃত হওয়ার পর দেখা গেল প্রেসে একশ কম্পোজিটর যে কাজ করে, তা একটি কম্পিউটার করতে পারে আরও কম সময়ে। আলাদা প্রুফ দেখার লোকেরও দরকার নেই। টাইমসের মালিক ছাপাখানা, প্রুফ সেকশনসহ পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে বরখাস্ত করে তাদের জায়গায় একশ কম্পিউটার কম্পোজিটর নিযুক্ত করেন।

 

টাইমসের পাঁচ হাজার শ্রমিক পাঁচ বছর ধর্মঘট করেও চাকরি ফিরে পাননি। একশ কম্পিউটার সেটার কাগজের প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিল। কায়িক শ্রমিকদের বদলে এখন যন্ত্রনির্ভর শ্রমিক শ্রেণি তৈরি হয়েছে। তাদের বলা হয়, 'হোয়াইট কলার লেবার'। এরা মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনে নামে না। কার্ল মার্কস যে শ্রমিক শক্তির দ্বারা দেশে দেশে বিপ্লব ঘটাবার কথা বলেছিলেন, সেই শ্রমিক শক্তি এখন উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতে নেই। মার্কস হোয়াইট কলার শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভবের কথা হয় তো কল্পনাও করেননি।
তবে এখন যদি রোবট মানুষের সব কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে পশ্চিমা জগতের এই হোয়াইট কলার শ্রমিকদেরও স্বার্থ বিপন্ন হবে। কিন্তু বিপন্ন হলেও তাদের কিছু করার থাকবে না। কারণ তাদের কোনো শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন নেই। একটি উদাহরণ দিই। লন্ডনের একটি বাসে এক সময় তিনজন কর্মচারী কাজ করতেন। একজন ড্রাইভার, একজন হেলপার এবং একজন টিকিট বিক্রেতা। এখন এই তিনজনের মধ্যে দু'জন ছাঁটাই হয়ে গেছেন। একজন ড্রাইভার বাস চালান। যান্ত্রিক উপায়ে বাসের দরজা খোলে এবং বন্ধ করে। যান্ত্রিক উপায়ে যাত্রীরা টিকিট কেনে। এখন লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতি বাসে এ রকম দু'জন দু'জন করে বাস শ্রমিক চাকরি হারিয়ে থাকলে কত হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন তা গুনতে গেলে বোঝা যাবে। এখন যদি রোবট এসে গাড়ি চালায় তাহলে হাজার হাজার ড্রাইভারের চাকরি যাবে।
ইংল্যান্ডে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলিউশন যে যান্ত্রিক যুগের সূচনা করেছিল, তাতে মানুষ প্রথমে আনন্দিত হয়েছিল। ভেবেছিল তারা কায়িক শ্রম থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু ক্যাপিটালিস্ট শ্রেণি এই যন্ত্রশক্তির একচেটিয়া মালিকানা দখল করার পর তারা বুঝতে পারে, তাদের জীবন-জীবিকার ওপর কী বিরাট হুমকি সৃষ্টি হয়েছে। যন্ত্রদানবের কবলে এখন মানবসভ্যতা ও মানবতা পিষ্ট হচ্ছে। এখন যন্ত্রদানবের পর যদি রোবট মানুষের স্থান দখল করতে থাকে, তাহলে মানুষ অলস, বেকার, কর্মহীন জীবন কীভাবে কাটাবে সেই প্রশ্নও এখন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি লন্ডনের গার্ডিয়ানে রোবটের একটি উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম- মানুষ কি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবে? রোবটের চ্যালেঞ্জ যে মানুষের স্থান দখল করে তাদের জন্য কোনো কাজই অবশিষ্ট রাখবে না। এমনকি সংবাদপত্রও প্রকাশ করবে তারা। সাংবাদিকরাও ভাতে মরবে। মানুষের জন্য এই যে চ্যালেঞ্জ, তা মানুষ কীভাবে মোকাবিলা করবে তা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি।
কিন্তু যন্ত্রশক্তি ও রোবট যদি মানুষকে কর্মহীন ও চাকরিছাড়া করে, তাহলে মানুষের জন্য তা হবে ভয়াবহ। এই সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। বলেছেন, শিশুরা এককালে অঙ্ক শিখত, যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগের কাজ মস্তিস্ক দ্বারা করত। এখন ক্যালকুলেটর আবিস্কৃত হওয়ায় তাদের আর গণিত শিখতে হয় না। বই পাঠ করার বদলে এখন তারা অনলাইনে সব দেখে। এর ফলে মানুষের মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা দিন দিন কমছে। এভাবে চলতে থাকলে মাথা আর কাজ করবে না। তাতে মানুষের দেহের আকৃতির বিকৃতি ঘটবে এবং তার উদ্ভাবনী শক্তি থাকবে না। বেকার মানুষের বিপুল সংখ্যা পৃথিবীর শান্তি ও অগ্রগতির ব্যাঘাত ঘটাবে।
ভবিষ্যতের এই ভয়াবহ বিপদ থেকে মানব ও মানবসভ্যতা কী করে বাঁচবে তার উপায় এখনও উদ্ভাবিত হয়নি। গার্ডিয়ানের একটি নিবন্ধে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, 'প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে অসংখ্য যুগের মানুষ জয়ী হয়েছে। কিন্তু সভ্য যুগের মানুষ কি যন্ত্রশক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হবে? এই যুদ্ধ তো দিন দিন নিকটবর্তী হচ্ছে।' আরও প্রশ্ন, পৃথিবীতে প্রাকৃতিক মানুষের যুগ শেষ হয়ে কি রোবট মানুষের যুগ শুরু হবে?
এই চ্যালেঞ্জ মানুষ কীভাবে রুখবে?
"সূত্র সমকাল"



সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি