সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২০
তাজউদ্দীনের আরো কথা ॥ মুজিব-ভুট্টো বাহাস
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 23 August, 2020 at 7:48 PM

বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে অতীতের রাজনৈতিক বিরোধের কথা ফাঁপিয়ে-ফুলিয়ে তুলে বর্তমানে প্রচার করে স্বার্থ উদ্ধারের যারা চেষ্টা করছেন, তাদের সম্পর্কে ঢাকার আরেকটি বাংলা দৈনিকে ‘তাজউদ্দীন-বিতর্ক :ইতিহাসের আলোকে’ শীর্ষক একটি চার কিস্তি নিবন্ধে বিস্তারিত লিখেছি।
আজ তাজউদ্দীন প্রসঙ্গেই আরেকটি কথা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের কখনো মতানৈক্য হয়নি, তা নয়। সেই মতানৈক্য কখনো মতবিরোধে পরিণত হয়নি। তাজউদ্দীন আহমদ তার নেতার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন সব সময়ই।

কিছু উদাহরণ দিই। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার কাছে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্যারিটি বাতিল করে ‘এক মাথা এক ভোট’ প্রথা প্রবর্তনের দাবি জানান। তাতে পূর্ব পাকিস্তান তার হারানো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাবে। তাজউদ্দীন আহমদ এই ব্যাপারে প্রথমে রাজি ছিলেন না। তার মত ছিল, আগে ইয়াহিয়ার কাছ থেকে একটি সাধারণ নির্বাচনের দাবি আদায় করা প্রয়োজন। একসঙ্গে বেশি দাবি তুললে ইয়াহিয়া নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার থেকে পিছিয়ে যেতে পারেন। ইত্তেফাকের মানিক ভাইও তাজউদ্দীন আহমদের অভিমতই প্রথমে সমর্থন করেন।

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর অভিমত ছিল, ‘বিড়াল মারিতে হইলে প্রথম রাত্রিতেই মারিতে হইবে। পরে ইয়াহিয়ার কাছ থেকে কোনো দাবি আদায় সম্ভব না-ও হতে পারে।’ ইত্তেফাকের পুরোনো অফিসে (১ রামকৃষ্ণ মিশন রোডে) এটা নিয়ে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদ, মানিক ভাই ও সিরাজউদ্দীন হোসেনের (পরবর্তীকালে একাত্তরে শহিদ) মধ্যে এক ঘরোয়া বৈঠক হয়। এই বৈঠকে ‘এক মাথা এক ভোট’ কেন দরকার তা বঙ্গবন্ধু ব্যাখ্যা করেন। বঙ্গবন্ধুর যুক্তি মানিক ভাই ও তাজউদ্দীন আহমদ মেনে নেন।

দুর্ভাগ্যের কথা, মানিক ভাই যে বঙ্গবন্ধুর যুক্তি মেনে নিয়ে তার নিজের মতও বদলেছেন, এ কথাটা তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চে’ লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েও লিখে যেতে পারেননি। মানিক ভাইয়ের লাস্ট রাজনৈতিক মঞ্চের ডিকটেশন আমি নিয়েছিলাম। ঢাকার প্রতাপশালী কাদের সর্দার তখন মারা গেছেন। মানিক ভাই কাদের সর্দারের মৃত্যুর প্রসঙ্গটি তার লেখায় এনেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, রাওয়ালপিন্ডি থেকে ফিরে এসে ভোটের প্রথা পরিবর্তন সম্পর্কে লিখব। সেই লেখা তিনি আর লিখে যেতে পারেননি। পরদিন তিনি রাওয়ালপিন্ডি যান। সেখানেই আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধুর এক মাথা এক ভোট দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। এই এক মাথা এক ভোটদানের ভিত্তিতেই পাকিস্তানের ’৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয়ের অধিকারী হয়, সেই প্রসঙ্গ এখানে বাহুল্য।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের ছোটখাটো মতানৈক্য হয়েছে। তা মতবিরোধে কখনো পরিণত হয়নি। যেমন লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদানের বিরোধী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তার যুক্তি ছিল, পাকিস্তান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিদান এবং পাকিস্তানের কাছে যে বিপুল আর্থিক ও অন্যান্য পাওনা আছে, তা মিটিয়ে দিতে এবং বাংলাদেশে আটক পাকিস্তানিদের (বিহারিদের) ফিরিয়ে নিতে যদি সম্মত হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু লাহোরে যেতে পারেন।

বঙ্গবন্ধুর যুক্তি ছিল, পাকিস্তান বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়েছে। এখন বঙ্গবন্ধু লাহোরে গেলে ভুট্টোর সঙ্গে বাংলাদেশের পাওনা, আটক বিহারিদের সম্পর্কে সামনাসামনি আলোচনা করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ একটি তাবেদার রাষ্ট্র বলে যে মিথ্যা প্রচারণা চলছে, লাহোরে আগত মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সেই ভুল ধারণা ভাঙতে পারবেন। তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর যুক্তি মেনে নিয়েছিলেন।

আরেকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের মতানৈক্য ঘটতে দেখেছি। আমেরিকা যেদিন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধু সেদিন ঘরোয়াভাবে গণভবনে উত্সব পালনের ব্যবস্থা করেছিলেন। কয়েক মণ মিষ্টির অর্ডার দিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন এর ঘোর বিরোধিতা করেন। আমি সেদিন সকালের দিকে গণভবনে গিয়েছিলাম। তাজউদ্দীন ভাই তার কিছুক্ষণের মধ্যে গণভবনে যান। প্রয়াত হানিফ মোহাম্মদ (পরবর্তীকালে ঢাকার মেয়র) তখন বঙ্গবন্ধুর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিনি প্লেট ভর্তি করে আমাদের রসগোল্লা দিলেন।

তাজউদ্দীন আহমদ হানিফকে বললেন, ‘তোমরা বিষ খাচ্ছ। এর পরিণতি বড় খারাপ হবে।’ বঙ্গবন্ধু ততক্ষণে গণভবনে তার বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে এসেছেন। তাজউদ্দীন আহমদের কথা শুনে বললেন, ‘তাজউদ্দীন, আমরা যাতে জাতিসংঘের সদস্যপদ পেতে না পারি, সেজন্য আমেরিকা চীনকে দিয়ে ভেটো দিয়েছে। আমদের মুক্তিযুদ্ধের সে বিরোধিতা করেছে। সেই আমেরিকা এখন আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের কি দ্বিতীয় বিজয় উত্সব পালন করা উচিত নয়? আমরা তো তা-ও করছি না। কেবল বিজয়ের আনন্দে মিষ্টি খাওয়াচ্ছি। এখন জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভও সহজ হয়ে যাবে। তুমি কি তা চাও না?’

তাজউদ্দীন বললেন, ‘লিডার, অবশ্যই আমিও তা চাই। আপনার যুক্তিও আমি মেনে নিচ্ছি। তবে আমেরিকাকে মিষ্টি খাইয়ে তুষ্ট করা যাবে কি না, সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। আমেরিকার মিত্রতা শত্রুতার চাইতেও বিপজ্জনক।’

আমি আমার প্লেট সাবাড় করে মিষ্টি খেয়েছি। তাজউদ্দীন একটি মিষ্টিও খাননি। তিনি প্লেট সরিয়ে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে জরুরি বিষয়ে আলোচনার জন্য এসেছি।’

আমি উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, আমি তবে আসি। বঙ্গবন্ধু চোখের ইশরায় বসতে বললেন। তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘মরক্কো সরকার আমেরিকার চাপে ফসফেট রপ্তানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। আমাদের কৃষি উত্পাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ ফসফেট দরকার। নইলে দেশে কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হতে পারে। উত্পাদনে বিপুল ঘাটতি, দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।’

বঙ্গবন্ধু বললেন, দ্রুত মরক্কো থেকে ফসফেট আমদানিতে বাধা কোথায়? তাজউদ্দীন বললেন, আজ কদিন ধরেই পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ড. নূরুল ইসলাম ফাইল বগলে নিয়ে ঘুরছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, অফিসাররা ঢাকা শহরে রেশনের দোকান বরাদ্দ করা নিয়ে বেশি ব্যস্ত। ফসফেটের চাইতে তাদের কাছে রেশনের দোকান বণ্টন করার গুরুত্ব বেশি। ড. নূরুল ইসলাম গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মরক্কো ফসফেটের রপ্তানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বাংলাদেশের কৃষির জন্য অত্যাবশ্যক ফসফেট আমদানি করতে চান।

বঙ্গবন্ধু বললেন, তাহলে আজই কেবিনেট মিটিং ডাকি। ড. নূরুল ইসলামও আসুন। তোমার ব্যাপারে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তাজউদ্দীন আহমদ মৃদু হেসেছেন। জবাব দেননি। কোনো রাজনৈতিক দলে অথবা মন্ত্রিসভার ভেতরেও এ ধরনের ছোটখাটো মতানৈক্য থাকেই। মেজরিটি ডিসিশনে তার নিষ্পত্তি হয় অথবা হয় লিডারের সিদ্ধান্তে। এটা কোনো নীতিগত বিরোধ নয়। দল ভাঙে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধে। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে কোনো নেতৃত্বের বিরোধ ছিল না।

(দুই)

আজকের লেখাটি শেষ করার আগে মুজিব-ভুট্টো বাহাস এবং তার নেপথ্যে তাজউদ্দীন আহমদের একটি ভূমিকার উল্লেখ করতে চাই। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। তারপর এই ছয় দফা প্রচার করার জন্য তখনকার সারা পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাঝে মাঝেই গ্রেফতার হয়েছেন। মুক্ত হয়েই আবার প্রচার অভিযানে বেরিয়েছেন।

অল্প দিনের মধ্যে ছয় দফা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পশ্চিম পাকিস্তানেও তা সাড়া ফেলে। আইয়ুব সরকার আতঙ্কিত হলেন। তারা ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদ, পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র আখ্যা দিলেন। এসব প্রচারণার দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। তার বিবৃতিতে বলা হলো, ‘ছয় দফা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবি নয়, এবং নতুন কিছু নয়। এটা একটা অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দাবি। পাকিস্তানে তারা বৈষম্যের শিকার। বঞ্চিত অঞ্চল। ছয় দফায় যে সহজ বিনিময়যোগ্য স্বতন্ত্র মুদ্রা এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য প্যারা মিলিশিয়া গঠনের দাবি জানানো হয়েছে, তা নতুন কিছুও নয়। যুক্তরাজ্যের অঙ্গীভূত স্কটল্যান্ডের নিজস্ব মুদ্রা, নিজস্ব জাতীয় পতাকা এমনকি স্বতন্ত্র পার্লামেন্টও রয়েছে। ছয় দফায় স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট, স্বতন্ত্র জাতীয় পাতাকারও দাবি জানানো হয়নি।

ছয় দফা কার্যকর করা হলে পাকিস্তানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানেও মানুষ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন পাবে।

তাজউদ্দীন আহমদের এই বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার সমর্থক সাংবাদিক কলামিস্ট জেড এ সুলেরি লাহোরের পাকিস্তান টাইমস পত্রিকায় ছয় দফা দাবির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে একটি কলাম লেখেন। তাতে তাজউদ্দীন আহমদের নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি তাজউদ্দীন আহমদের বিবৃতির জবাব দেওয়ার জন্যই তার কলামটি লিখেছেন। কিন্তু কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি। যেমন চেষ্টা করেছেন, ছয় দফা পাকিস্তান ভাঙার জন্য ভারতের চক্রান্ত এটা প্রমাণ করতে। তার বক্তব্য ধোপে টেকেনি।

শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে নামেন তখন আইয়ুবের মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে এক সভায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারেন এই বলে যে, শেখ মুজিবের যদি সাহস থাকে, তাহলে ঢাকায় প্রকাশ্য জনসভায় যেন ভুট্টোর সঙ্গে তর্কে নামেন। এই তর্কে তিনি শেখ মুজিবকে পরাস্ত করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে প্রমাণ করে দেবেন, ছয় দফা অন্যায় এবং পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্যও ক্ষতিকর।

ঢাকা, করাচি ও লাহোরের দৈনিকে এই চ্যালেঞ্জ প্রকাশিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টোর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং ঢাকার পল্টন মাঠে একটি নির্দিষ্ট দিনে এক সভায় হাজির হওয়ার আমন্ত্রণ জানান ভুট্টোকে। খবরটি ঢাকার কাগজে ‘মুজিব-ভুট্টোর বাহাস’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় এবং তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) তুমুল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সভায় তারিখ ও স্থান ঘোষিত হওয়ার পর দলে দলে লোক ঢাকায় আসতে শুরু করে। অনুমান করা হয়, পল্টন ময়দানে জনারণ্য তৈরি হয়ে তা গুলিস্তানসংলগ্ন রাজপথ ঢেকে ফেলবে।

এই সময় তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে ১৫ পুরানা পল্টনে তখনকার আওয়ামী লীগ অফিসে ডেকে পাঠালেন। এই অফিসে তখন প্রায় সর্বক্ষণ থাকতেন আনোয়ার চৌধুরী নামের এক ভদ্রলোক। আরেক জন থাকতেন, তার নাম নুরুল ইসলাম। আমরা তাকে ডাকতাম পোস্টার নুরুল ইসলাম। আনোয়ার সাহেব ছিলেন দীর্ঘদেহি। নূরুল ইসলাম ছিলেন খর্বাকৃতির। দুজনেই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্ধ অনুসারী। পরে জেনেছি, আনোয়ার চৌধুরী বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিকের মামা।

সেদিন তাজউদ্দীন আহমদের তলব পেয়ে আওয়ামী লীগ অফিসে গিয়ে দেখি, তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে বসে আনোয়ার চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ করছেন। আমাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ‘আপনি তো সময়মতো এসে গেছেন। আর দুজনের তো দেখা পাচ্ছি না।’ বললাম, আর দুজন কে? তিনি বললেন, ‘একজন হচ্ছেন মোহাম্মদউল্লা চৌধুরী (পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) এবং অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক ছাত্র। তাকে আপনি চিনবেন না।’

আমি আর কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বললেন, ভুট্টো মুজিব ভাইকে ছয় দফা নিয়ে তার সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নামার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন তা জানেন তো? বললাম, একটা কাগজ চালাই (তখন আমি ‘আওয়াজ’ নামে একটি সান্ধ্য দৈনিকের সম্পাদক), আর এ খবর রাখব না? তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘লিডারের নির্দেশ ভুট্টো তাকে কী কী এবং কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন, তার একটা তালিকা তৈরি করে দিতে। তাহলে তিনি প্রস্তুত হতে পারবেন। আমি তাই আপনাকে ডেকেছি। আপনি প্রশ্নের একটা তালিকা তৈরি করুন। আমিও করব। মোহাম্মদউল্লাও করবেন। এই তালিকা লিডারকে দেব। জবাবগুলো তিনিই ঠিক করবেন।’

ইতিমধ্যে মোহাম্মদউল্লা চৌধুরী এসে গেলেন। এসে গেলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই ছাত্রটিও। তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ভুট্টো মনে করেন শেখ মুজিব একজন মেডিওকার নেতা। ভুট্টোর তুখোড় ইংরেজিতে সেক্সপিয়ার, রুশো, হার্বার্ট স্পেনসারের উদ্ধৃতি দেওয়া বক্তৃতার সামনে শেখ মুজিব চুপসে যাবেন। কিন্তু আইয়ুবের এই সাগরেদ জানেন না শেখ মুজিব কী মানুষ! সম্ভাব্য মুজিব-ভুট্টো বাহাস নিয়ে আমরা তখন উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগের অফিস থেকে ফিরে এসে জানালাম, ভুট্টো বিতর্কে যোগদানের জন্য ঢাকায় এসেছেন। উত্তেজনায় আমার ঘুম এলো না। রাতে ঘরে বসে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে কী ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন তার একটা তালিকা তৈরি করে ফেললাম। পরদিন তা তাজউদ্দীন ভাইয়ের হাতে পৌঁছে দিলাম।

শেষ পর্যন্ত বাহাসের দিনটি এসে গেল। পল্টনের মাঠে সভামঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। ভুট্টোর নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত সিকিউরিটি পুলিশ পল্টনের মাঠ পরিদর্শন করে গেছে। চীনাবাদাম বিক্রেতা বালকদেরও পল্টনের মাঠে সেদিন ঢোকা বারণ করে দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে ময়দানে লোক জমছে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন দুই নেতা এসে সভামঞ্চে দাঁড়াবেন। জানা গেল বঙ্গবন্ধু প্রস্তুত। তিনি ৩২ নম্বর থেকে রওনা হয়েছেন।

এই সময় আকস্মিকভাবে একটি বজ্রাঘাত হলো। হঠাত্ করে জানা গেলো, ভুট্টো ঐ দিন পিআইএর সকালের ফ্লাইটে কাউকে কিছু না জানিয়ে রাওয়ালপিন্ডি ফিরে গেছেন। খবরটা প্রথম বিশ্বাস হয়নি। তারপর সরকারি মহল থেকেই জানা গেল, তিনি ঢাকা ত্যাগ করেছেন। খবর শুনে হতাশ জনতা ভুট্টোকে গালমন্দ করে মাঠ ছেড়ে চলে যায়। পরদিন সব দৈনিকেই ভুট্টোর এই আকস্মিক ঢাকা ত্যাগের খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। একটি দৈনিক এই খবরের ব্যানার হেডিং দিয়েছিল—ভুট্টোর পলায়ন।

এখানেই মুজিব-ভুট্টো বাহাসের শেষ। তারপর বহুদিন গত হয়েছে। প্রায় অর্ধশতক আগের কথা। সুদূর বিদেশে বসে অতীতের দিকে মাঝে মাঝে দৃষ্টি ফেরাই আর ভাবি, আমিও তো অর্ধশতকের বেশি সময়ের ইতিহাসের অনেক নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী। তাহলে কেন পারলাম না বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিমের মতো একটি উপন্যাস লিখতে?


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি