সোমবার, ০৬ এপ্রিল, ২০২০
জামায়াত দিল্লির দাঙ্গাকে পুঁজি করে মাথা তুলতে চায়
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 8 March, 2020 at 9:13 PM

কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ থেকে আগত কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে আমার বাসাতেই আড্ডা দিচ্ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন আওয়ামী লীগের এমপি। কথায় কথায় বাংলাদেশে জামায়াতের কথা উঠল। জাতীয় সংসদের সদস্য বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম, দেশে বিএনপির অবস্থা তো জানি। কিন্তু জামায়াতের অবস্থা কী? তিনি সশব্দে হেসে উঠলেন এবং একটি ছড়া কাটলেন :
তাই তাই তাই বাংলাদেশে যাই
বাংলাদেশে গিয়ে দেখি জামায়াত নাই
আবার জিজ্ঞাসা করেছি, সত্যি বলছেন, বাংলাদেশ জামায়াতমুক্ত হয়েছে? তিনি আবারও কৌতুকের সুরে বললেন, জামায়াতি নেতাদের মৃত্যু হয়েছে ফাঁসিতে। আর জামায়াতের মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিকভাবে। একটু সিরিয়াস হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছি, হেফাজতিদের সমর্থন পেয়ে কি আপনারা এ কথা বলছেন? জামায়াতিরা তো হেফাজতিদের মধ্যে ঢুকে থাকতে পারে।
আমার প্রশ্নের জবাবটা দিলেন আরেক বন্ধু। তিনিও আওয়ামী লীগের সমর্থক। বললেন, জামায়াতিরা হেফাজতে ইসলামে ঢুকবে কেন? তারা তো আওয়ামী লীগের মধ্যেই ঢুকে বসে আছে। সুযোগ খুঁজছে কখন মাথা তুলবে। এমপি বন্ধু সজোরে মাথা নাড়লেন, বাংলাদেশের মাটিতে জামায়াতিরা আর নেই। যারা আছে তারা তালপাতার সেপাই। তার কথা শুনে খুব একটা আশ্বস্ত হলাম না। কারণ, আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশের অবস্থা সম্পর্কে যা বলেন, আরেক নেতা তা বলেন না।
এই মুজিববর্ষে স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের আধিক্যে আলোর নিচে অন্ধকার জমা হওয়ার মতো দেশের আসল অবস্থাটা ঢাকা পড়ে গেছে। পুলিশ ও র্যাব প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শুদ্ধি অভিযানে নেমে ক্যাসিনোকা-ে যাদের ধরেছে, তারা অধিকাংশই যুবলীগের নেতা। শহিদ শেখ ফজলুল হক মনির হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান যুবলীগের আজ এই অবস্থা। মহিলা যুবলীগের চেহারা উদ্ঘাটন করে দিয়েছে পাপিয়াকা-। ছাত্রলীগের অবস্থা ভালো কি? এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদচ্যুত করেছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকেও সরাতে হয়েছে। এই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা। তাহলে খোদ আওয়ামী লীগের অবস্থা কী? অনেকেই বলছেন, জামায়াতের মৃত্যু হয়নি। তারা সাপের মতো খোলস পালটেছে মাত্র। আগে তারা বিএনপি দখল করেছিল। এখন চাতুর্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি জামায়াতের উচ্ছেদ না ঘটে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হয়নি। তারা সুযোগের অপেক্ষায় প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে বিরত রয়েছে। বিএনপির হাতে যেমন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই, তেমনি জামায়াতিদের হাতেও কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই। আফগানিস্তানে তালেবানরা আমেরিকার ট্রাম্প সাহেবের সঙ্গে সন্ধি করে ফেলায় এবং সৌদি রাজারা ইজরায়েলের কোলে গিয়ে বসায় জামায়াতিদের কাছে ‘ইসলাম রক্ষারও’ কোনো ইস্যু নেই। হাসিনা সরকারের সতর্কতার ফলে মসজিদে ইমাম সেজে ধর্মপ্রচারের নামে তাদের ‘জেহাদিস্ট’ প্রোপাগান্ডা চালানোরও সুযোগ কম।
কিন্তু দীর্ঘদিন পর তারা তাদের ইপ্সিত ইস্যু আবার পেয়েছে এবং প্রকাশ্য রাজনীতিতে মাথা তুলেছে। এই ইস্যুটি হলো দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকায় আগমনের সিদ্ধান্ত। দিল্লিতে দাঙ্গা বাধিয়ে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলমান হত্যা, আক্রান্তদের রক্ষায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্যের বর্বরতা আজ সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত এই ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তার এক বক্তৃতায় কাশ্মীর সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন। এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্টও দিল্লির দাঙ্গা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই দাঙ্গা বাধিয়ে বিজেপি সুবিধা করতে পারেনি। কিছু অসহায় মানুষকে হত্যা করে, তাদের দোকানপাট-ঘরবাড়ি পুড়িয়ে, মসজিদে আগুন দিয়ে, অন্য ধর্মের মানুষকে ভয় দেখিয়ে জয়রাম বলতে বাধ্য করে গণতান্ত্রিক ভারতের মুখ পুড়িয়েছে মাত্র। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা মোদি সরকারের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার। ভারতের অধিকাংশ মিডিয়া পর্যন্ত দিল্লির দাঙ্গাকে মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে গুজরাটের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের অনেকে মোদি সরকারের কাশ্মীর-নীতিরও তীব্র সমালোচনা করছেন। তাই দিল্লির দাঙ্গার জন্য গোটা ভারত এবং ভারতের জনগণকে দায়ী করা চলে না। ভারতবিদ্বেষ প্রচার করা চলে না। বরং বাংলাদেশের মানুষের উচিত, নিজ দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে রোখা এবং ভারতে সাম্প্রদায়িকতা রোখার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা। বাংলাদেশে পালটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে ভারতের সাম্প্রদায়িকতার দানবকে রোখা যাবে না। বরং তাকে সাহায্য করা হবে।
দিল্লির মুসলমানেরা এই সত্যটি বুঝেছেন। তাই তারা পালটা হিংসার পথ গ্রহণ না করে ভোটবাক্সে দলে দলে আমআদমি পার্টিকে ভোট দিয়ে বিপুল জয়ের অধিকারী করেছেন এবং বিজেপি ভারতের প্রাণকেন্দ্রে গোহারা হেরেছে। শুধু দিল্লিতে নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনেও বিজেপি একের পর এক পরাজিত হয়েছে। বলতে গেলে মোদি-হাওয়া থেকে ভারত আবার মুক্ত হতে চলেছে মনে হয়। ব্রিটেনে তিন-তিন বার নির্বাচন জয়ী মার্গারেট থ্যাচার অনিচ্ছুক জনগণের ওপর পোলট্যাক্স চাপাতে গিয়ে জনরোষেই নিজের পতন ঘটিয়েছিলেন। বর্তমান ভারতেও মোদি সরকারের সংশোধিত নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে সারাদেশে ব্যাপক আন্দোলন চলছে। গেরুয়াধারীদের দ্বারা সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়েও বিজেপি ভারতে ক্ষমতায় থাকতে পারবে কি না সন্দেহ। বুঝতে কষ্ট হয় না। এই আশঙ্কা এবং দিল্লির নির্বাচনে কেজরিয়ালের অনিবার্য জয় ঠেকানোর জন্যই বিজেপির চাণক্য নামধারী অমিত শাহ তার গেরুয়া বাহিনী দ্বারা পরিকল্পিতভাবে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু নিরীহ মুসলমান হত্যা ছাড়া নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দশ্যে সফল করতে পারেননি। বরং বিজেপি স্বদেশে-বিদেশে নিন্দিত হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে গুজরাটে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো হয় এবং মোদিও সেজন্য অভিযুক্ত হন। মার্কিন সরকার তাকে আমেরিকা-সফরের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সেই মার্কিন সরকারই নরেন্দ্র মোদি যখন বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ভারতের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমেরিকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন ভারতে যা-ই ঘটুক, তাকে কেন্দ্র করে সে দেশটির নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সরকার মুজিববর্ষ পালনের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ না জানিয়ে পারে না। মোদি ব্যক্তিগতভাবে যা-ই হোন, সরকারিভাবে এখনো তিনি বাংলাদেশের সবচাইতে বড়ো মিত্র দেশের প্রধানমন্ত্রী, শত্রু দেশের নয়।
এই সত্য জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি—বিশেষ করে, জামায়াত আবার প্রকাশ্যে মাথা তুলেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করে ভারতবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, যা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর উসকানিদানের সমতুল্য। এই দাঙ্গা বাধানো হলে অতীতের মতো বাংলাদেশের নিরীহ, নির্দোষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—বিশেষ করে, হিন্দু ও বৌদ্ধরা নির্যাতিত হবে। একসময় কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দাঙ্গাবাজেরা যে নিধনকার্য চালিয়েছে, তাতে ভারতের মুসলমানদের কোনো উপকার হয়নি বরং অপকার হয়েছে।
ঢাকার কাগজে কক্সবাজার, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, ভোলা, রাজশাহী, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সভা ও মিছিলের খবর বেরিয়েছে তার প্রত্যেকটির উদ্যোক্তা জামায়াত। এগুলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভা হলে কথা ছিল না। কিন্তু সভা ও মিছিলের স্লোগান ও ভাষা আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক। মোদিকে কসাই মোদি আখ্যা দিয়ে তার ঢাকা-সফর বাতিল এবং তাকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। ভারতে মুসলিম-নিধনের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে জামায়াত নেতারা ভারতবিদ্বেষী এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অশান্তি ঘটাতে পারে। নিজের নিরাপত্তার প্রশ্নে মোদি নিজেও ঢাকা সফর বাতিল করতে পারেন।
তাতে ক্ষতি হবে মুজিববর্ষ পালনের সৌষ্ঠবের। বাংলাদেশে সম্প্রদায়িকতার দানব এবারেও সাম্প্রদায়িক অশান্তি ঘটাতে সক্ষম হবে—এমন কথা বলছি না, কিন্তু সরকারকে সময় থাকতে সাবধান হতে হবে। সংখ্যালঘুরা যাতে নির্যাতিত না হয় তার আগাম ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। দিল্লির দাঙ্গার প্রতিবাদ জানানোর অজুহাতে দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি—বিশেষ করে জামায়াত আবার মাথা তুলতে চাইছে। এই মাথা তোলাই প্রমাণ করে বাংলাদেশে জামায়াত এখনো মরেনি। এদের বিষদাঁত এখনই ভেঙে দেওয়া হোক। দিল্লির দাঙ্গার প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব। তা হবে ভারতের অসাম্প্রদায়িক জনগণের সঙ্গে একাত্মতামূলক। ভারতবিদ্বেষ প্রচার বা দেশের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার উসকানিমূলক ভাষা তাতে থাকবে না। 


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি