রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২০
নতুন নেতৃত্ব আসছে যুব মহিলা লীগে
হাজারিকা অনলাইন ডেস্ক
Published : Thursday, 27 February, 2020 at 9:39 PM

২০০২ সালে আওয়ামী যুব মহিলা লীগের জন্মলগ্ন থেকেই নেতৃত্বে রয়েছেন নাজমা আখতার ও অপু উকিল। দীর্ঘদিন সংগঠনে একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও এবার তাদের নেতৃত্বে থাকা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউয়ের চোখ ধাঁধানো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্যে আসার পর বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সরকারি দলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা জানান, খুব শিগগিরই যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আখতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিলকে তাদের পদ থেকে অপসারণ করা হবে এবং জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলটির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, খুব শিগগিরই যুব মহিলা লীগের নতুন কমিটি গঠন করা হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হবে। আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নুর পাপিয়ার বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ব্যাপারে জানতে পেরে অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সূত্র জানায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় এই ব্যাপারে আলোচনা হয়। সভায় যুব মহিলা লীগের বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নতুন কমিটি গঠন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন দলের সিনিয়র নেতারা। এমনকি, যুব মহিলা লীগ বিলুপ্ত করার পরামর্শও দেওয়া হয়।
সূত্র আরও জানায়, সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন বহির্ভূত কাজের সাথে যারা জড়িত আছে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবো আমি। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই যুব মহিলা লীগের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সদ্য বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নুর পাপিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত উপযুক্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এদিকে এসব বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে নাজমা আখতার ও অপু উকিল জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে দলের কাউন্সিলের সম্ভাব্য তারিখ জানতে চেয়েছেন তারা। নাজমা ও অপু আরও জানান, বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে দলের ভেতর পাপিয়ার মতো অপরাধের সাথে যুক্ত আরও কেউ আছে কিনা তা খুঁজে বের করতে বলেছেন।

তবে গণভবন সূত্রে জানা যায়, যুব মহিলা লীগের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বিশেষ খুশি হননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিতে হয় যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। প্রধানমন্ত্রী যখন নিচে আসেন তখন তারা ভয়ে ভয়ে গিয়ে দলীয় সভানেত্রীকে সালাম দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের কাছে জানতে চান কেন এসেছ? জবাবে যুব মহিলা লীগের দুই নেত্রী বলেন, নেত্রী আপনি সব জানেন। আমরা সংগঠনের ভাবমূর্তিটা ধরে রাখতে পারলাম না। এখন আমাদের করণীয় কী? আপনি যে নির্দেশ দেবেন, আমরা তা-ই করবো। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তোমরা সংগঠনের নেতৃত্বে আছ। কে কোথায় কী করছে তার খবর রাখতে হবে। এক শ্রেণির লোক সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে চলেছে। তাহলে তোমাদের সংগঠনের প্রতি দায় কোথায়? সচেতনতা কোথায়? তোমাদের খোঁজখবর রাখা উচিত ছিল। শুধু একজন পাপিয়াই জড়িত নয়, এ ঘটনায় আরও অনেকেই জড়িত। তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ সময় নাজমা ও অপু উকিল প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আপা পাপিয়াকে এত টাকা কারা দিল? একটি হোটেলে থাকা ও খরচ বহনের টাকা কোথায় পেল? এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তারাও রেহাই পাবে না। আমি এরই মধ্যে তাদের সন্ধান করতে নির্দেশ দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কারা কী করছে সব তথ্য আমার কাছে আসছে। অনেকের নাম এসেছে। আমি কাউকে ছাড়ব না। ঢাকায় কোথায় কে কী করছে, সব তথ্য আমার কাছে আছে। একজনও ছাড় পাবে না। এ সময় সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সারা দেশের সংগঠনের নেত্রীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, সারা দেশে খোঁজখবর নাও। ছাকনি দিয়ে ছেকে নাও। সংগঠনের ইমেজ উদ্ধার করতে হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, যুব মহিলা লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতা নিয়ে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ে আলোচনা চলছে। পাপিয়ার কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর আওয়ামী লীগ এবং এবং যুব মহিলা লীগ বেশ বিব্রতকর অবস্থায় আছে। বিশেষ করে পাপিয়ার সঙ্গে সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং মন্ত্রীদের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে শেয়ার হওয়ার পর এটি তাদের মধ্যে বিরাট অস্বস্তি তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠনকে শিগগিরই ঢেলে সাজানো হতে পারে। সেক্ষেত্রে যেকোনো সময়ে নাজমা আক্তার ও অপু উকিলেরও অন্য দুই সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মতো ভাগ্যবরণ করতে হতে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন যুব মহিলা লীগের নেতৃবৃন্দ। বৈঠক প্রসঙ্গে যুব মহিলা লীগের সহ-সভাপতি ডেইজি সরোয়ার বলেন, দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিষদ আলোচনা করা হয় বৈঠকে। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমাদের সংগঠনে পাপিয়ার মতো কাউকে প্রয়োজন নেই।
পাপিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কায়কোবাদ কাজী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া জানিয়েছেন, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিলের সাথে তার সম্পর্ক ভালো। এছাড়া আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ নেতার সাথেও তার সম্পর্ক ছিল। তবে এই সম্পর্ক সাংগঠনিক নাকি একান্তই ব্যক্তিগত পর্যায়ের, সে বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।

আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতার সঙ্গে পাপিয়ার সম্পর্ক ছিল তা প্রকাশ করেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পাপিয়া অত্যন্ত চতুর। তার কাছ থেকে কথা বের করা খুবই জটিল। অনেক কিছুই এড়িয়ে যেতে চায়। কিছু কিছু কথার আবার মিল পাওয়া যায় না।
প্রসঙ্গত, মাদক-অস্ত্র চোরাচালান, জমি দখল ও হোটেলে নারীদের দিয়ে যৌন বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে শনিবার ঢাকা বিমানবন্দর থেকে পাপিয়া, তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন ওরফে সুমন চৌধুরী এবং তাদের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।
র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত পাপিয়া গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের ‘প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইট’ ভাড়া নিয়ে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়ে হোটেলে বিল দিতেন কোটি টাকার উপরে।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর পাপিয়াকে এরইমধ্যে বহিষ্কার করেছে যুব মহিলা লীগ। কারা পাপিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, তাদেরও খুঁজে বের করা হবে বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন। যুব মহিলা লীগের এই নেত্রী ধরা পড়ার আগে ধরা হয়েছিল যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকার বিভিন্ন ক্রীড়া ক্লাবে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনার প্রমাণ পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্যাসিনোকাণ্ডে সমালোচিত হয়ে আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় ওমর ফারুক চৌধুরীকে। একই ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীমসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পদ ছাড়তে হয় রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে। একই অভিযোগে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউসার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ পদ হারান। এর আগে সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১১ মার্চ যুব মহিলা লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে নাজমা আক্তারকে সভাপতি এবং অধ্যাপিকা অপু উকিলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এর তিনমাস পর ২৫ জুলাই যুব মহিলা লীগের ১২১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চে বর্তমান কমিটির মেয়ার শেষ হওয়ার কথা।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি