রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২০
৫৬ বছরেও কেউ খবর রাখেনি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত লাকসাম পাবলিক হলের
Published : Tuesday, 25 February, 2020 at 8:31 PM

কুমিল্লা প্রতিনিধি ॥
১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থী ফিল্ড মার্সাল আইয়ুব খান আর আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী কায়েদে আজম জিন্নার ছোট বোন ফাতেমা জিন্নাহ। । প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আইয়ুবে প্রতীক গোলাপ ফুল আর ফাতেমা জিন্নার প্রতীক হারিকেন। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনো বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেননি। তখন সারা বাংলাদেশ তিনি ফাতেমা জিন্নার পক্ষে নির্বাচনী জনসভাগুলোতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রেখেছেন। তাকে তখন আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা বলত সিংহ মানব হিসেবে। নির্বাচনের জ্বরে তখন সারাদেশ আক্রান্ত। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৯৬৪ সালের ১২ ডিসেম্বর কুমিল্লার লাকসাম পাবলিক হলে এক বিশাল নির্বাচনী সমাবেশ হয়। সেই সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।এই পাবলিক হলকে ঘিরে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর অনেক স্মৃতি ,অনেক ইতিহাস।আজ লাকসামের সেই পাবলিক হল বেদখল হয়ে লাকসাম পৌরসভার কার্যালয় হয়েছে। মূল পাবলিক হলটি আছে যুগের পর যুগ পরিত্যক্ত হয়ে। পাবলিক হলের বর্তমান সভাপতি ও লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই জানতেন না এটা যে পাবলিক হল আর এখানে বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন।এটা তিনি নিজেই জানিয়েছেন এ প্রতিবেদককে। বঙ্গবন্ধুর সেই জনসভার নানা স্মৃতি রোমথন করেছেন ,সেই জনসভা সফল করা সংগঠকদের মধ্যে একজন সম্ভবত তিনিই বর্তমানে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে লাকসামে প্রথম পাতার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যিনি সামনে থেকে জনমত সংগঠিত করেছেন এবং ১৯৬৪ সালে লাকসাম সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি হলেন সিরাজুল ইসলাম । তাঁর কাছ থেকে জেনেও সরেজমিনে লাকসামের ঐতিহাসিক পাবলিক হলে গিয়ে জানা যায়, ১৯৫০ দশকের শেষ দিকে লাকসামের উত্তর বাজার সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ প্রশাসনের সহায়তায় লাকসাম পাবলিক হল ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পাবলিক হলের সামনে ছিল একটি বিশাল পুকুর আর একটি মাঠ। তৎকালীন সময়ে লাকসামের যে কোন বড় বড় রাজনৈতিক সভা সমাবেশ গুলো এই পাবলিক হল মাঠে হতো। এলাকার শিক্ষা -সংস্কৃতির বিস্তারে এই পাবলিক হল ও পাঠাগারের ভুমিকা রয়েছে ব্যাপক। পাবলিক হল সংলগ্ন পুকুর ও মাঠটি বেদখল হয়ে আছে বিভিন্ন স্থাপনায়। মুল পুকুরের জায়গায় গড়ে উঠেছে লাকসাম পৌরসভা কার্যালয়। আর পাবলিক হলের দোতালায় রয়েছে লাকসাম প্রেস ক্লাব। লাকসামের এই লাইব্রেরীতে রয়েছে শত বছরের উপরের অনেক দূর্লভ বই,পুঁথিসহ নানা প্রকাশনা। যথাযথ সংরক্ষনের অভাবে এই দুস্প্রাপ্য বই গুলো আজ নষ্ট হতে বসেছে।
 অবহেলা আর অনাদরে পাবলিক হলটি গত ৫ দশক ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর অনেক স্মৃতি। প্রায় পক্ষকাল ধরে বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধ্যান করে ও লাকসাম উপজেলা বর্তমান আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলামের বরাত দিয়ে জানা যায়, ৪০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চাঁদপুরের শাহরাস্তির ছেলে আবদুল আউয়াল লাকসামের গাজিমুড়া মাদ্রাসায় আসেন পড়াশুনা করতে। আবদুল আউয়াল মাদ্রাসার ছাত্র হলেও ছোট বেলা থেকেই প্রগতিশীল চিন্তা ও ধ্যান ধারনা নিয়ে তিনি বেড়ে উঠেন। তাই লাকসাম গাজিমুড়া মাদ্রাসায় পড়াকালীন সময়েই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিজকে সম্পৃক্ত করেন। ফলে ব্রিটিশ সরকারের চাপে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কার করে দেয়। মেধা মননে আর দেশ প্রেমে আবদুল আউয়াল ছিলেন অনন্য। মাদ্রাসা থেকে তার ছাত্রত্ব বাতিল হলেও তিনি লাকসাম থেকেই রাজনীতি করতে থাকেন।এক পর্যায়ে তিনি লাকসাম থানা আওয়ামীলীগৈর সভাপতি ও কুমিল্লা জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হন পরবর্তী পর্যায়ে তিনি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকও হন। তিনি এমসিএও নির্বাচিত হন। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুবই ঘনিষ্ট এবং আস্থা ভাজন ছিলেন আবদুল আউয়াল। তখন নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা ছিল না। এ সকল এলাকা ছিল লাকসাম থানার অধীন। ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানে ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষনা করে তিনি নিজেই মুসলিম লীগ থেকে গোলাপ ফুল প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হলেন। অপর দিকে,আওয়ামীলীগসহ সমগ্র পাকিস্তানের সকল বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম জিন্নার ছোট বোন ফাতেমা জিন্নাহ। তার প্রতিক ছিল হারিকেন। মৌলিক গণতন্ত্র নামের এই নির্বাচনের ভোটার ছিলেন স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। কুমিল্লার সবচেয়ে বড় থানা ছিল লাকসাম। ২৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় এই থানা। রাস্ট্রপতি নির্বাচনে এই থানায় মোট ভোটার ছিল ২৩৯টি। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তখন সারা পূর্ব পাকিস্তান বেশ উত্তপ্ত।আবদুল আউয়াল সাহেব ছিলেন আমাদের নেতা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী জনসভা লাকসামের পাবলিক হলে হবে ১৯৬৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন তিনি বঙ্গবন্ধু হননি। তখন আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ তাকে সিংহ মানব বলে ডাকত। আউয়াল সাহেব এই জনসভাকে সফল করার জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দদের দায়িত্ব দিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করতে লাগলেন। জনসভার খরচ উঠানের জন্য বর্তমানে বিভিন্ন মসজিদের দান বাক্সের মত ছোট ছোট বাক্স তৈরী করে কর্মীদের কাছে দিতেন বাজারে বাজারে ঘুরে চাঁদা উঠাতে। প্রায় সকল দোকানীরাই এক পয়সা. দুই পয়সা করে দিতেন। ১৯৬৪ সালে লাকসাম সদর ইউনিয়নের আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও বর্তমানে উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি মো.সিরাজুল ইসলাম আরো বলেন,বঙ্গবন্ধু তখন বঙ্গবন্ধু হননি। তখন আমরা তাকে সিংহ মানব বলে জনগনের কাছে উপস্থাপন করতাম। সমাবেশে বক্তব্যের আগে যিনি উপস্থাপন করতেন তিনি শেখ মুজিবুর রহমান বলার আগে সিংহ মানব বলতেন। আমাদের নেতা আউয়াল ভাইয়ের নির্দেশ ছিল যে ভাবেই হোক সিংহ মানবের সমাবেশ সফল করতে হবে। তখন আমরা কর্মীরা হাটে হাটে দানের বাক্সের মত বা´ নিয়ে চাঁদাবাজি করি।







সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি