বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০
নিপাহ ভাইরাস কী জানেন না সাতক্ষীরার গাছিরা, নেই প্রচারণা
Published : Tuesday, 28 January, 2020 at 9:06 PM

 জেলা প্রতিনিধি ॥
চলছে শীতের মৌসুম। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের কাঁচা রস খাওয়ার প্রবণতাও কম নয়। তবে এই খেজুরের কাঁচা রসেই ছড়িয়ে থাকে নিপাহ নামক ভাইরাস। যে ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অধিকাংশ মানুষেরই মৃত্যু ঘটে। সাতক্ষীরা জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিপাহ ভাইরাসের বিষয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান সতর্কতামূলক প্রচার-প্রচারণা নেই। ভয়াবহ এ ভাইরাসের খবর জানেন না গাছিরা। জানা নেই সাধারণ মানুষদেরও। নিপাহ ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করা স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মিরজাদী সেবরিনা ফ্লোরা গত বছরের ১৮ নভেম্বর নিপাহ ভাইরাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩১৩ জন মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ২১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরে আক্রান্ত হয়েছেন আটজন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন পাঁচজন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা গাছি আব্দুল কাদের (৩৮)। ১৬ বছর ধরে প্রতি বছরই শীত মৌসুমে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। রস বিক্রি ও রস থেকে গুড় তৈরি করে বিক্রি করেন হাট-বাজারে। শীত মৌসুমে ৪৫-৫০ হাজার টাকা রোজগার করেন তিনি। তবে তিনি জানেন না, খেজুর রসের ভয়াবহ নিপাহ ভাইরাসের খবর। গাছি আব্দুল কাদের বলেন, শীত মৌসুমে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করেই শীত মৌসুমে রোজগার করি। উপার্জনের সেই অর্থ দিয়েই চলে সংসার। এ বছর আমি ৭০-৮০টা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছি। খেজুর গাছে বিভিন্ন পাখিসহ রাতে বাদুড় মুখ দেয়। সেই রসই আমি বিক্রি করি। তবে নিপাহ ভাইরাস বলে কিছু আছে সেটি আমার জানা নেই। একই গ্রামের ওই গাছির প্রতিবেশী আবু সাঈদ সরদার বলেন, খেজুরের কাঁচা রস আমরা প্রতিনিয়তই খাই। শুধু আমি নই এলাকার বহু মানুষ কাঁচা রস খেয়ে থাকেন। বিকেলে বা সন্ধ্যায় হাট-বাজারে গাছিরা কাঁচা রস বিক্রি করেন। অনেকেই কাঁচা রস খেতে পছন্দ করেন।
কাঁচা রসে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়, আক্রান্ত হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে- এ বিষয়টি জানেন কি না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খেজুরের রস খাওয়ার ব্যাপারে এখন থেকে সতর্ক থাকব। জেলার তালা উপজেলা সদরের শিবপুর গ্রামের গাছি আবু বক্কার হোসেন বলেন, আমি ৩০টা খেজুর গাছ থেকে এ বছর রস সংগ্রহ করছি। সকাল থেকে খেজুর গাছে ভাড় (মাটির মাত্র) ঝুলাতে ঝুলাতে দুপুর হয়ে যায়। এরপর বিকেলে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বিক্রি করি। প্রতি ভাড় খেজুরের কাঁচা রস ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া রস জ্বালিয়ে উৎপাদিত গুড় বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকায়। কাঁচা রসে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায় এ ঘটনা আমাকে কেউ বলেনি।
ওই এলাকার মাঝিয়াড়া বাজারের ব্যবসায়ী রুবেল মোল্লা বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই কাঁচা খেজুরের রস খায়। নিপাহ ভাইরাসের সতর্কতামূলক স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো প্রচারণা আজও চোখে পড়েনি।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) চিকিৎসক কাজী আরিফ বলেন, চলতি বছর পাঁচজন রোগী সন্দেহজনক হওয়ায় তাদের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরে পাঠিয়েছি। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ফলাফল আমরা পায়নি। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগী আমার কাছে আসেনি। নিপাহ ভাইরাসসহ ১০-১২টি ভাইরাস নিয়ে কাজ করা সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের স্টাফ ও সাতক্ষীরা ফিল্ড রিসার্চ অ্যাসিট্যান্ট হাসানুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরায় চলতি বছর বা তার আগে কতজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তার সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই। আমরা নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার হেড অফিসে প্রেরণ করি। সেখান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো ফলাফল সাতক্ষীরায় পাঠানো হয় না। যার কারণে তথ্যটি আমাদের কাছে নেই। তবে সম্প্রতিও চলতি বছর বেশ কয়েকজনকে সন্দেহজনক হওয়ায় তাদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খামারবাড়ীর অফিস সহকারী শেখ হাফিজুর রহমান জানান, বর্তমান শীত মৌসুমে জেলাব্যাপী ৪০ হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা।
 কোনো কৃষক খেজুর গাছের বাড়তি চাষ করেন না। পতিত জমিতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এসব গাছ। যার কারণে গাছের সংখ্যা কমে গেছে। ২০১৮ সালে জেলায় খেজুরের গুড় উৎপাদন হয়েছিল ৮২২ মেট্রিকটন। আশা করছি, চলতি বছর ৮০০ মেট্রিকটন ছাড়িয়ে যাবে।
নিপাহ ভাইরাসের ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক রয়েছে জানিয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. মো. হুসাইন সাফায়েত জানান, এটি একটি সংক্রামক রোগ। একবার আক্রান্ত হলে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন, মৃত্যু হতে পারে। শীতকালে গ্রামে এ ভাইরাসটি বেশি ছড়ায়। মূলত খেজুরের কাঁচা রস থেকে এ ভাইরাসটি বেশি ছড়িয়ে থাকে। কোনো অবস্থাতেই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। তবে ফুটানো খেজুরের রস খাওয়া নিরাপদ। তিনি বলেন, জেলাব্যাপী সকল স্বাস্থ্যকর্মীকে নিপাহ ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্কতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী উঠান বৈঠকেও এ ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে।
গ্রামপর্যায়ে নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অবগত নয় এ বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষদের সতর্ক করার জন্য আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি