বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০
আন্তর্জাতিক রঙ্গমঞ্চে ট্রাম্পের নাটক
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 19 January, 2020 at 9:30 PM

আন্তর্জাতিক রঙ্গমঞ্চে নাটক জমে উঠেছে। অধিকাংশ নাটকেই একজন ভাঁড় থাকেন, এই নাটকেও একজন ভাঁড় আছেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ভাঁড় এখন পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদে বসেও তার ভাঁড়ামি যাচ্ছে না। তার একশ্রেণির ক্রিটিক (যার মধ্যে আমেরিকানও আছেন) বলছেন, তিনি শুধু ভাঁড় নন, কাপুরুষও। ইরানের জনপ্রিয় সেনা অফিসার কাশেম সোলেইমানিকে হত্যা একটি কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড।
এই হতাকাণ্ড ঘটানোর পর সিংহের মতো গর্জন করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ইরান এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মার্কিন ঘাঁটিতে যদি আক্রমণ চালায়, তাহলে তিনি ইরানকে এমন শাস্তি দেবেন, যাতে ইরান আর মাথা তুলতে পারবে না।’ ইরান বাগদাদে আমেরিকার মূল ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প এবার হুমকি নয়, সুর নরম করে বলেছেন, ইরান হামলা চালিয়েছে বটে; কিন্তু তাতে মার্কিন ঘাঁটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এখন প্রমাণিত হয়েছে, ট্রাম্পের এই উক্তি একটি মিথ্যাচার। আমেরিকা সরাসরিভাবে স্বীকার করেছে, ইরানের মিসাইল হামলায় মার্কিন ঘাঁটির ক্ষতি হয়েছে। ১১ জন মার্কিন সৈন্য আহত হয়েছে। কোনো কোনো পশ্চিমা মিডিয়াতেই বলা হচ্ছে, ইরানি হামলায় মার্কিন সৈন্যের মৃত্যুর খবরটি মার্কিন সরকার এখনই হয়তো স্বীকার করতে চাইছে না, তাই গোপন করা হচ্ছে।
আগেই বলেছি, ট্রাম্প চরিত্রগতভাবে ভাঁড়। তাই মিথ্যা বলতে তিনি লজ্জা পান না। বহুবার তার মিথ্যাচার ধরা পড়েছে। এমনকি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কেও তিনি মিথ্যাচার করায় তার বিরুদ্ধে কংগ্রেসে ইমপিচমেন্ট অর্ডার পাশ হয়েছে। এখন হয়তো সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিনি এই শাস্তি থেকে বেঁচে যাবেন, কিন্তু দুর্নাম এড়াতে পারবেন না।
ট্রাম্প ধূর্ত। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে সোলেইমানিকে হত্যা করেছেন, এ কথাটা জানেন। এই ব্যক্তিগত স্বার্থ হলো মার্কিন শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের কাছে নিজের পড়ন্ত জনপ্রিয়তা উদ্ধার করে ইমপিচমেন্ট থেকে বাঁচা এবং আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়া। কিন্তু বাইরে এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য প্রচার করা হচ্ছে। কাশেম সোলেইমানি গোটা পশ্চিমা স্বার্থের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন স্বার্থ সাংঘর্ষিক। ফলে আমেরিকা যেমন সেনা ঘাঁটি রেখে বৈধ-অবৈধ নানাভাবে নিজেদের স্বার্থ ও আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, ইরানও সেটা করবে এটাই স্বাভাবিক। কাশেম সোলেইমানি ইরানের পক্ষে এই দায়িত্বই পালন করছিলেন। এ অবস্থায় তাকে কাপুরুষোচিতভাবে গুপ্ত হত্যা করা যদি বৈধ হয়, তাহলে একই যুক্তিতে ইরান যদি ট্রাম্প বা পশ্চিমা কোনো জেনারেল বা নেতাকে হত্যা করার চেষ্টা করে, তা বৈধ হবে কি? আর যে ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেলকে হত্যা করা হয়েছে, তা কি বিনা যুদ্ধ ঘোষণা করা যায়? সোলেইমানি হত্যা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল। আমেরিকা বিনা যুদ্ধ ঘোষণায় সোলেইমানিকে হত্যা করেছে। ইরানও বিনা যুদ্ধ ঘোষণায় বাগদাদে মার্কি ঘাঁটির ওপর হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান প্রতিশোধ নিতে চাইলে ইরানকে ধ্বংস করবেন। তাহলে ইরান প্রতিশোধ গ্রহণের পর তিনি গোঁফ নামালেন কেন? তার যে যুদ্ধ করার খায়েশ অথবা সক্ষমতা নেই, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে উত্তর কোরিয়ার শাসক কিমকে ধমক-ধামক দিতে যাওয়ার সময়। কিম বয়সে ট্রাম্পের তুলনায় বালক। তিনি ট্রাম্পের নাকে দড়ি দিয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত তাকে টেনে নিয়ে গেছেন, কিন্তু পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো থেকে বিরত হননি। কোরিয়া সংকটে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কিল খেয়ে কিল হজম করতে হয়েছে। ইরানের ব্যাপারেও তা-ই হতে যাচ্ছে। ধূর্ত ট্রাম্প এখন হুমকির বদলে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছেন। সাম্প্রতিক বাগদাদ ক্রাইসিসের সময় তেহরান থেকে ইউক্রেনগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হয়। দেড় শতাধিক যাত্রীর সবাই নিহত হয়। দেখা গেছে যাত্রীদের অধিকাংশই ইরানি নাগরিক। আরো ধরা পড়েছে, আমেরিকার বিরুদ্ধে মিসাইল হামলা চালানোর সময় একটি মিসাইল ভুলে ইউক্রেনগামী বিমানটিকে আঘাত করে। এটি একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যা বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে বিক্ষুব্ধ ও শোকাহত করেছে। ইরানের সুপ্রিম লিডার আল্লামা খামেনি নিজেই এই অপরাধের কথা স্বীকার করে বলেছেন, এটা ক্ষমাহীন অপরাধ। তিনি সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণদানের কথা ঘোষণা করেছেন। তাতে ইরানের শোকাহত মানুষ সান্ত্বনা পায়নি। তারা হাজারে হাজারে রাজপথে নেমে তাদের শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই গণমিছিলে বর্তমান মোল্লা-শাসনের বিরোধী ইরানিরাও ছিল। তারা শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে, এটা স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলো, শোক মিছিল থেকে ইরানের রেজিম উচ্ছেদের স্লোগানও দিয়েছে কেউ কেউ। অনেকের ধারণা, সিআইএ এই বিশাল শোক মিছিলে তাদের ভাড়া করা কিছু ‘এজিটেটর’ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তারা এই রেজিম উচ্ছেদের হিংসাত্মক স্লোগান দিয়েছে। এ ধরনের সাবভারসিব কাজে মার্কিন সিআইএ দক্ষ। ইরানে ডা. মোসাদ্দেক যখন বিশাল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এবং গণ-অভ্যুত্থানে ইরানের শাহ দেশত্যাগ করে বিদেশে আশ্রয়প্রার্থী, তখন শাহের সমর্থনে তেহরানে বিরাট পালটা গণসমাবেশ ঘটানো হয়েছিল। তাতে শাহের অনুগত সামরিক বাহিনী সমর্থন দেয়। মোসাদ্দেক সরকারের পতন ঘটে। মোসাদ্দেককে গ্রেফতার করা হয়। শাহ দেশে ফিরে আসেন। এ ঘটনার কয়েক মাস পরেই মার্কিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করে, মোসাদ্দেকবিরোধী এই পালটা সমাবেশ ছিল রেন্টেড ক্রাউড। অর্থাত্, সিআইএর ভাড়া করা জনতা। অর্থবৃষ্টি দ্বারা এবং শাহের অনুগত সামরিক বাহিনীর সহায়তায় এই জনতা সংগ্রহ করা হয়। তাদের মধ্যে ছিল সাদা পোশাক পরা কয়েক হাজার ইরানি সৈন্য। ইরানে এই খেলার পুনরাবৃত্তি ঘটানো ট্রাম্প বা সিআইএর পক্ষে সম্ভব নয়। ইরানের বর্তমান মোল্লা শাসন আর সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারের মধ্যযুগীয় মৌলবাদী শাসন এক নয়। ইরানের মোল্লাবাদ আধুনিক এবং জনগণের সমর্থনপুষ্ট। ইসলামি বিপ্লবের পর সামরিক ও অসামরিক প্রশাসন তারা ঢেলে সাজিয়েছেন। পশ্চিমা গণতন্ত্রের ফাঁকফোকরগুলো গোড়াতেই তারা বন্ধ করে রেখেছেন, যাতে ওই ফাঁকফোকরের সাহায্যে সিআইএ ঢুকে পড়তে না পারে। এর ফলে এই আধুনিক মোল্লা-শাসন এখনো টিকে আছে এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তগুলো এখন পর্যন্ত ব্যর্থ করে দিতে পারছে। পশ্চিমা গণতন্ত্রের মরুদ্যানের মরীচিকার পেছনে দৌড়ালে এতদিনে খামেনিদের অবস্থা হতো আলেন্দে ও বঙ্গবন্ধুর মতো।
আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তবু ভাবছেন, বিমান দুর্ঘটনায় শোকার্ত এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ইরানি জনগণের কপট মিত্র সেজে তিনি তাদের বিভ্রান্ত করতে পারবেন এবং তেহরানে রেজিম চেইঞ্জ করতে পারবেন। একুশ শতকের ইরানি জনগণ বেকুব নয়। ট্রাম্পের চালবাজি তারা বোঝেন। আমেরিকার কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধজ্ঞায় ইরানি জনগণ আজ পিষ্ট। সোলেইমানির হত্যার পর আমেরিকা এই অর্থনৈতিক সেঙ্কশন আরো বাড়িয়েছে।
সাদ্দামের আমলে ১২ বছর যাবত্ ইরাকে এই অর্থনৈতিক অবারোধ চালিয়ে আমেরিকা অনাহারে-অপুষ্টিতে ১৭ লাখ ইরাকি নরনারী ও শিশু হত্যা করেছে। ইরান-ইরাক আট বছরব্যাপী যুদ্ধের সময় ইরান এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমানে ভুলক্রমে নয়, ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন সহায়তায় ইরাক মিসাইল হামলা চালিয়েছিল। তাতে তিন শতাধিক যাত্রী নিহত হয়। তখন পশ্চিমা জগতে বর্তমানের মতো মায়াকান্না দেখা যায়নি। ইরানের মানুষ এসব কথা জানে এবং এই জানার ভিত্তিতেই তারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং সফল সংগ্রাম চালাচ্ছে। ইরানের বর্তমান রেজিমের বিরুদ্ধে তাদের স্বাভাবিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ আছে। ট্রাম্প সাহেব এর সুযোগ নিয়ে এই বিক্ষোভকে সরকারের উচ্ছেদের আন্দোলনে পরিণত করবেন, সে আশা দুরাশা। তিনি তেহরানের গণবিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের উত্সাহ জোগাতে চেয়েছেন। ইরানি জনগণ এটাকে গ্রহণ করবে কপটতা ও ভাঁড়ামি হিসেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প শিগিগর দেখবেন, তেহরানের এই গণবিক্ষোভে সিআইএ যাদের প্লান্ট করেছে এবং যেসব সাবোটিয়ার রয়েছে, ইরান সরকার তাদের ধরে ফেলেছে এবং শাস্তি দিচ্ছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব তখন মায়াকান্না জুড়বে, ইরানে বাক্স্বাধীনতা নেই। সরকারবিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করা হচ্ছে। ট্রাম্প সাহেবের মুখে মানবতা ও গণতন্ত্রের কথা শুনে মানুষ হাসবে। আন্তর্জাতিক রঙ্গমঞ্চে এই ভাঁড়ামির নাটক কবে শেষ হবে তা কে জানে?


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি