সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
বিলাতের রাজনীতিতে টিউলিপ ও জাইমা সমাচার
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 9 December, 2019 at 9:21 PM

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি এবং তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান বিলাতের লিঙ্কনস-ইন থেকে সসম্মানে ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন তিনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
এ কৃতিত্ব অর্জনের জন্য তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। তিনি বংশের গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। তার দাদা জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
বংশের এ ধারাবাহিকতা জাইমা ভঙ্গ করেছেন। মা জোবায়দা রহমান অবশ্য চিকিৎসক। লন্ডনে এসেও উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। কিন্তু পিতা তারেক রহমান দীর্ঘ ৮ বছর লন্ডনে অবস্থানকালে শুধু বিলাসবহুল হোটেলে রাজনৈতিক সভা করে মিথ্যা ইতিহাস চর্চা করেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাতৃভূমিতে বসবাস করা সত্ত্বেও রাজনৈতিক শিক্ষা দূরের কথা, সাধারণ শিক্ষা লাভেও আগ্রহ দেখাননি। তার সর্ব আগ্রহ ছলেবলে-কৌশলে বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল এবং আবারও হাওয়া ভবনের অধীশ্বর হওয়া। জাইমা রহমান বংশের এ কুপ্রবণতা ভঙ্গ করেছেন। সম্ভবত জিয়া পরিবারের প্রভাবের চেয়ে মা ডা. জোবায়দার বংশের প্রভাব জাইমার ওপর বেশি পড়েছে। তিনি পিতার যথেচ্ছ বিলাসিতা এবং অসাধু রাজনীতি চর্চার মধ্যেও ৮ বছর লন্ডনে থাকার সুযোগের অপব্যবহার করেননি। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্যারিস্টার হয়েছেন।
ডা. জোবায়দা রহমান তারেক রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী। তার আগে জেনারেল আতিকের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়ে টেকেনি। নানা কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ডা. জোবায়দা শিক্ষিত এবং সুন্দরী মহিলা। সাবেক নৌসেনাপতি মাহবুবুর রহমানের তিনি কন্যা। মাহবুবুর রহমান সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমিক নৌসেনাপতি ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে এই বিয়ে হতো কি না, সন্দেহ। বিলাতে বাস করেও তারেক রহমান দেশে বাস করার সময় গুরুতর অপরাধের জন্য আদালতে বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত হন। এ দণ্ড এড়ানোর জন্যই তিনি বিলাতে বসবাস করছেন। দণ্ডিত অপরাধী হিসেবে তিনি দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারেন না এবং পারবেন না। এ জন্য বিএনপির নেতৃত্বে তার স্থলে জোবায়দাকে বসানোর চেষ্টা তারেক করেছিলেন। খালেদা জেলে এবং তারেক দীর্ঘকাল বিদেশে স্বেচ্ছা নির্বাসিত। এ অবস্থায় তারেকের মাথায় নতুন দুষ্টবুদ্ধি খেলেছিল। বিএনপিতে তার স্থলে নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন তার সুন্দরী ও শিক্ষিত স্ত্রী জোবায়দা। তাহলে তার দলের নেতাদের মন গলবে এবং নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে জোবায়দা হবেন তারেকের প্রক্সি হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রী। জোবায়দা যে বিএনপির নেতা পদে তারেক রহমানের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন, এই মর্মে দেশের মিডিয়ায়ও গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল।
খালেদা জিয়া দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে গেছেন। তারেক রহমানও বিদেশে দীর্ঘ নির্বাসন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু ডা. জোবায়দা রহমান বিএনপির নেত্রী পদে বসেননি। দলের নেত্রী পদে তার বসার গুজবটাও ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছিল, জোবায়দা রাজনীতিতে এলেন না কেন? আমি বিলাতে বাস করি। তার ওপর সাংবাদিক হিসেবে একটি ‘তৃতীয় কর্ণও’ আছে। আছে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ কিছু মহলের সঙ্গে যোগাযোগও।
ফলে আমার তৃতীয় কর্ণে কিছু খবর পৌঁছাতে দেরি হয়নি। যাচাই-বাছাই করে দেখেছি, খবরগুলো একেবারে অসত্য নয়। ডা. জোবায়দা রহমান বিএনপির নেত্রী পদে বসবেন এ খবরে দলটির একদল নেতাকর্মী প্রথমে প্রকাশ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস দেখালেও পরে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তারেক রহমানের মতো এক বালখিল্য তরুণের নেতৃত্বই বিএনপির অনেক শীর্ষ ও প্রবীণ নেতা সহ্য করতে পারছেন না। সে ক্ষেত্রে জোবায়দার মতো রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এবং বয়সে একেবারেই তরুণ এক নারীকে নেতা বলে কুর্নিশ করতে হবে, এটা বিএনপির একদল শীর্ষ নবীন এবং প্রবীণ নেতা মেনে নিতে চাননি। দলের ভেতর এই গোপন ঝড়ের আভাস পেয়ে তারেক রহমান এ ব্যাপারে পিছিয়ে যান। এখন তিনি টেলিফোনে ও ভিডিও কলে দলকে নির্দেশ পাঠানো গায়েবি নেতা। আমার তৃতীয় কর্ণে পাওয়া আরেকটি খবর হল, বিএনপির নেত্রী পদে স্বামীর প্রক্সি হওয়া বা রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে ডা. জোবায়দা রহমান কিছুমাত্র আগ্রহ দেখাননি। তিনি বহু অন্যায় চাপের কাছে মাথা নত করেছেন; কিন্তু অসাধু রাজনীতিতে তাকে ব্যবহারের জন্য অন্যায় চাপের কাছে মাথা নত করেননি। এটি নিয়ে পারিবারিক শান্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারত; কিন্তু কন্যা জাইমার বড় হয়ে ওঠা এবং মায়ের পক্ষ গ্রহণে তারেক রহমান সুবিধা করে উঠতে পারেননি।
এখন তারেক রহমান তার একমাত্র মেয়ে জাইমা বড় হয়ে ওঠায় এবং লিঙ্কনস-ইন থেকে ব্যারিস্টার হওয়ায় তাকে নিয়ে আরেক বুদ্ধির খেলা খেলতে চান। এক দুর্বল মুহূর্তে তিনি তার এক বন্ধুর কাছে নিজের মনের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। সেই বন্ধুই লন্ডনের বাজারে কথাটা ছড়িয়েছেন। তারেক বন্ধুকে বলেছেন, জাইমা ব্যারিস্টার হওয়াতেই তিনি সন্তুষ্ট নন, তাকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তা দেখতে চান।
তারেকের কথিত বয়ান অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে শুধু একজন প্রভাবশালী নেতা নন, তিনি পার্লামেন্টে সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় ব্রিটেনের রাজনীতিতেও শেখ পরিবারের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে।
এই প্রভাবকে ঠেকা দিতে না পারলে জিয়া পরিবার ভবিষ্যতে আর কোনোদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পা রাখতে পারবে না। মাতা-পুত্রের ভবিষ্যৎও সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে যাবে।
এই অবস্থা ঠেকানোর জন্য ব্রিটেনের গত দুই সাধারণ নির্বাচনে টিউলিপ সিদ্দিককে হারানোর জন্য কনজারভেটিভ দল যত চেষ্টা করেছে, তার চেয়ে বেশি করেছে বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন তারেক রহমান।
আসন্ন ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও টিউলিপকে হারানোর জন্য তারেক কোমর বেঁধে লেগেছেন। এ জন্য টিউলিপের বিরুদ্ধে জোর অপপ্রচার চলছে। এমন কোনো অপবাদ নেই, যা টিউলিপকে দেয়া হচ্ছে না। প্রমাণ হয়েছে মিথ্যা প্রচারে তারেক রহমানের মস্তিষ্ক গোয়েবলসের চেয়েও উর্বর। তারেক রহমান নাকি আশা করেন- ব্রিটিশ আইনজীবী মহলে ব্যারিস্টার জাইমার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে তাদের সাহায্যে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ঘটাবেন এবং নিজেকেও সব মামলা-মোকদ্দমা ও কারাদণ্ডাদেশ থেকে মুক্ত করে দেশে ফিরতে পারবেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি আবার ক্ষমতায় যাবে এবং শেখ পরিবারের ওপর কঠোর প্রতিশোধ নেবে। জাইমাকে ব্রিটিশ এমপি করার ব্যাপারে তার আশা, এবারের নির্বাচনেও টিউলিপ সিদ্দিকের জয় ঠেকাতে না পারলেও ভবিষ্যতে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠাতে পারলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে টিউলিপ তথা শেখ পরিবারের প্রভাব ঠেকানো যাবে। জাইমা সম্পর্কে এ খবর কতটা সঠিক জানি না। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পেয়েছি। জাইমা মাত্র ব্যারিস্টার হলেন। সুতরাং ব্রিটিশ আইনজীবী মহলে ঠাঁই পেতে তার বহুদিন লাগবে। অন্যদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সদস্য হওয়া তো বহু দূর-দূরান্তের ব্যাপার। ততদিনে তারেকের আশার তরু শুকিয়ে মারা যেতে পারে। তাছাড়া জাইমা সম্পর্কেও শুনেছি, তিনি মা ডা. জোবায়দা রহমানের দ্বারা বেশি প্রভাবিত। মুখে বাবার অসাধু রাজনীতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মনে মনে অসন্তুষ্ট। তিনি ব্যারিস্টার হয়েছেন পেশাজীবী আইনজীবী হওয়ার জন্য। পিতার অসাধু রাজনীতির উত্তরাধিকার বহনের জন্য নয়। আমারও ধারণা, দৈত্যকুলে প্রহ্লাদের জন্মের মতো জাইমা রহমান জিয়া পরিবারে জন্ম নিলেও এই পরিবারের হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি উত্তরাধিকার বহনে রাজি হবেন না। উদার গণতন্ত্র ও মানবতার দেশ ব্রিটেনের আলো-বাতাসে মানুষ হয়ে তিনি দাদি খালেদা ও পিতা তারেকের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা রাখলেও তাদের কলঙ্কিত পথ অনুসরণে রাজি হবেন না।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি