বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯
বিদেশি পর্যটক আসতে বাধা কোথায়?
হাজারিকা অনলাইন ডেস্ক
Published : Sunday, 29 September, 2019 at 10:10 AM


বিদেশি পর্যটক আসতে বাধা কোথায়?সরকারি হিসেবে গতবছর বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক ঘুরতে এসেছেন মাত্র দুই লাখ ৬৭ হাজার ৭০৭ জন। কিন্তু প্রতি বছর এক শ কোটিরও বেশি পর্যটক সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে। তাহলে কেন আর বেশি সংখ্যক পর্যটক বাংলাদেশে আসছে না? বাধা কোথায় এখানে? পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, অনেক প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন, বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চল, উপতাক্য, ঝর্ণা, নদী, পাহাড়ি ঝিরি নদীমাতৃক বাংলাদেশ। ষড় ঋতুর বৈচিত্র ও নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশ পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময়। কিন্তু এ সম্ভবনা কাজে লাগলো যাচ্ছে না কেন?

কারণ খুঁজতে গিয়ে বের হয়ে এলো দেশের পর্যটন স্পটগুলোতে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। স্পটগুলোতে বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। তার ওপর এখন বিভিন্ন দেশে তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশে ভ্রমণে সতর্কতা দিয়ে রেখেছে। অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক প্রচার নেই বলে সম্ভাবনাময় এই খাতটি বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা যাচ্ছে না বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের পাবলিকেশন অফিসার প্রেম প্রসাদ ভট্টরিয়ার সঙ্গে কথা হয় শনিবার ঢাকায় শেষ হওয়া এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারে। বাংলাদেশে কীভাবে বিদেশি পর্যটক আরও বেশি আনা যায় এ ব্যপারে প্রশ্ন ছিল তার কাছে। প্রেম প্রসাদ ভট্টরিয়া বলেন, এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। তার ওপর রাজধানীতে প্রচুর জ্যাম, এটা কমাতে হবে। আর পর্যটকরা যেন নিরাপদে স্বাচ্ছন্দে ভ্রমণ করতে পারে। এয়ারপোর্টে এসে যেন সহজেই বিদেশি পর্যটক গাড়ি অথবা ভ্রমণ গাইড পায়। একটা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

কটেজ মালিক সমিতি অব সাজেক এর সদস্যভুক্ত লক্ষণ কটেজ সালকা এর মালিক জন বলেন, সাজেকে (রাঙ্গামাটি জেলা) বিদেশি নাগরিকদের ভ্রমণের জন্য আগে থেকেই অনুমতি নিতে হয়। তার ওপর রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া। এটা ওয়ানস্টপ সার্ভিস দিলে ভালো হয়। তাহলে বিদেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণ বাড়বে।
ভ্রমণ ও পর্যটক বিষয়ক ইংরেজি পাক্ষিক দি বাংলাদেশ মনিটর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম  বলেন, বিদেশি পর্যটক আনতে এখন কোন ট্যুরিজমকে প্রাধান্য দিতে হবে সেটা ঠিক করতে হবে। কোনটা আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই যায়গাটি এখনও নির্ধারণ হয়নি। এ জায়গাগুলো নির্ধারণ দরকার। বিদেশি পর্যটক কেন বড়ছে না, আমরা এগুচ্ছি না কেন সেটা নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রতিনিয়তই শুনছি এটা হবে ওটা হবে কিন্তু হচ্ছে না কেন। তিনি বলেন, পর্যটন বিষয়ে ২৮ বছর ধরে একটা সাময়িকী চালাই। কিন্তু আমরা জানতে পারছি না কোন দেশ থেকে কত পর্যটক আমাদের দেশে আসছে। এ ডাটা আমরা পাচ্ছি না।

বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশে পর্যটন এলাকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত কক্সবাজার। কিন্তু দেখা যায় বেশিরভাগই দেশীয় পর্যটক সেখানে। কক্সবাজারে কয়েকদিন আগে ঘুরে এসেছেন হাসিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরাইতো কক্সবাজারের ব্যবস্থায় খুশি না । সেখানে বিদেশি পর্যটকরা আকৃষ্ট হবেন কীভাবে। শুধু সাগর আর কতক্ষণ দেয়া যায়। রাতে কোথাও ঘোরার ব্যবস্থা নেই। বিনোদনের জন্য ব্যবস্থা নেই। যেখানে সেখানে ময়লা। কোন নারী বিচে গোছল করতেও স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। কারণ চারদিকে ভিডিও আর ছবি তোলা শুরু হয়ে যায়।

চীনে ভ্রমণের জন্য সেবা দিয়ে থাকা এক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে  বলেন, আমাদেরও খারাপ লাগে শুধু বাংলাদেশ থেকে চীনে পর্যটক নিচ্ছি। আমরা চীনাদের বলি বাংলাদেশে আসার ব্যপারে। কিন্তু তারা যে বিষয়টি তুলে ধরে সেটা হলো এখানে ভ্রমণে খরচ বেশি। এর চেয়ে কম খরচে তারা থাইল্যান্ড ঘুরতে পারে। এর ওপর এখানে হোটেল ভাড়া অন্য দেশের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। নিরাপত্তার বিষয়টাও তারা বলে। তারা কোন কিছু কিনতে গেলে সেটার দাম বাড়িয়ে দেয় দোকানদাররা।  

রাজধানীতে গত আট বছর ধরে প্রতি বছর আয়োজন হচ্ছে এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার। আয়োজক কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিন হেলাল বলেন, বিদেশি পর্যটক টানতে আমাদের প্রথম প্রয়োজন ট্যুরিজম পণ্য ডেভলপ করা। বাংলাদেশে পর্যটক কেন আসবে এর উত্তর পেলেই পর্যায়ক্রমে কাজ হবে। একজন পর্যটক এয়ারপোর্টে এলে তাকে যে সেবা দেয়া প্রয়োজন সেটা কত সল্প সময়ে দেয়া যায়। এরপর পর্যটক হোটেলে গেল। হোটেলে গিয়ে যে ধরনের এন্টারটেনমেন্ট দরকার সেটা কি কমপিটিটিভ কিনা সেটা আমাদের ভাবতে হববে। এর পর পর্যটক কোথায় যাবে কী দেখবে, দেখার যায়গা কী আমাদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কী না। আমাদের এ বিষয়গুলো খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। উন্নয়ন করতে হবে। মূল যায়গা হলো পর্যটনকে ব্যান্ডিং করতে হবে। এটি শুধু সকরারের একার কাজ নয়। সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে বেসরকারি প্লাটফর্মগুলোকে এক করা, তাদের সঙ্গে কাজ করা। বর্তমান সরকার এ ব্যপারে সাপোর্ট করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যটনেরর ব্যপারে দেশে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, এখন সমন্বিত কাজ করতে হবে।

অনেকদিন ধরে পর্যটন নিয়ে কাজ করছেন সৌয়দ গোলাম কাদের। সম্প্রতি পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতে এক অনুাষ্ঠানে তিনি তুলে ধরেন কেন বিদেশি পর্যটক কমছে দেশে। তিনি বলেন, আমাদের মূল কাজ এখন হয়নি। হলি অর্টিজানের ঘটনার পর তিনটি বছর কেটে গেল। এখনও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা বজায় রেখেছে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে রেড এলার্ট, কেউ অরেঞ্জ এলার্ট, কেউ ইয়োলো অ্যালার্ট দিয়ে রেখেছে। এটি নিরসনে ফরেন মিনিস্ট্রির সঙ্গে পর্যটন মন্ত্রণলয়ের কথা বলতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা পর্যটকদের সম্ভাবনার কথা বলছি। সম্ভাবনার মধ্যে আমরা আটকে আছি। আগে বিদেশি পর্যটক আসতে হবে। বিদেশি পর্যটক কীভাবে বাংলাদেশে আসবে এবং সংখ্যাটি কীভাবে বাড়বে তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, বিদেশি পর্যটক টানতে ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকার সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সার্বিক অবস্থা ভালো। এর জন্যই জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ট্যুর অপারেটররা আমাদের দেশে পর্যটক পাঠাতে আগ্রহী হয়েছে। হলি আর্টিজান হামলার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আমাদের দেশে ভ্রমণ অ্যালার্ট জারি করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে সম্মিলিতভাবে এসব অ্যালার্ট দূর করতে ও বিদেশি পর্যটক টানতে আমরা কাজ করছি।

২০১৪ সাল থেকে এ বছর জুন পর্যন্ত এসেছে ১৩ লাখ বিদেশি:

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে জুলাই পর্যন্ত একলাখ ৮৯ হাজার ৮৯৭ জন পর্যটক বাংলাদেশে ভ্রমণ করেছেন। আর ২০১৮ সালে দুই লাখ ৬৭ হাজার ৭০৭ জন, ২০১৭ সালে দুই লাখ ৬৫ হাজার ৪৯১ জন, ২০১৬ সালে দুই লাখ ৯ জাহার ৯৫ জন, ২০১৫ সালে একলাখ ৪১ হাজার ৯১৭ ও ২০১৪ সালে এক লাখ ৫৮ হাজার ৯৪৮ জন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছেন। যারা পর্যটক ভিসায় এসেছেন এ হিসেবটি তাদের।

ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল ২০১৯ সালে তাদের রিপোর্টে বলেছে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই ট্র্যাভেল এবং ট্যুরিজম খাত, যা কিনা পুরো বিশ্বের জিডিপির প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। পৃথিবীর গড়ে ১০টি কর্মসংস্থানের একটি (৩১৯ মিলিয়ন) এই খাত সরবরাহ করছে।

বৈশ্বিক গড় সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা বা বিদেশি পর্যটকদের না টানতে পারার জন্য বেশ কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান মো. বদরুজ্জামান ভুঁইয়া। বলেন, বিদেশি পর্যটকদের না টানার পেছনে তিনি প্রধানত চারটি কারণ। ‘প্রথমত, পর্যটন খাতে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব। দ্বিতীয় কারণ দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব। তৃতীয়ত, পর্যটনের সঠিক লোক সঠিক জায়গায় নেই। অর্থাৎ দক্ষ গবেষকদের কাজে না লাগিয়ে অদক্ষ লোকদের সেখানে রাখা রয়েছে। চতুর্থ কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পর্যটন স্থানগুলোকে আধুনিক, টেকসই বা যুগপোযোগী করা হয়নি। যার কারণে বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও বিদেশি পর্যটকদের টানা যাচ্ছে না।’

নেয়া হচ্ছে পদক্ষেপ:

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক  বলেন, পর্যটন খাতের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা হচ্ছে। আমরা এরইমধ্যে ফার্ম নির্বাচন করেছি। অক্টোবরের ৭ তারিখে  ফার্মকে ওয়ার্ক অর্ডার দেব। এতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। আমরা বেসকারি ট্যুর অপারেটদের জন্য আইন তৈরি করেছি। তিনি বলেন, দেশের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে আমাদের সবার উদ্যোগ প্রয়োজন। এখন সব পর্যটন স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশ আছে।  দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক আবদুস সামাদ বলেন, ‘পর্যটন একটি মহুমাত্রিক শিল্প। বিশ্বে পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের অংশিদারিত্ব এবং অংশগ্রণ হয়তো কাঙ্খিত মাত্রায় এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে, সরকার এ সেক্টরের উন্নয়নে কাজ করছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ পর্যকটন করপোরেশন ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কাজ করছে। আমাদের ন্যাশন্যাল হোটেল এবং ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনিস্টিটিউটে এ পর্যন্ত ৫০ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমরা মানব সম্পদ উন্নয়নে কাজ করছি।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি