মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০১৯
গুজব না হয়ে যেন সত্য খবর হয়
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 8 April, 2019 at 10:01 AM

গুজব না হয়ে যেন সত্য খবর হয়গণফোরামের নির্বাচনজয়ী দুই নেতা সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান দলের নির্দেশ অমান্য করে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। সেজন্য একজন দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। অন্যজনও শাস্তি পেতে যাচ্ছেন বলে বাজারে খবর রটেছে। এতে মনে হচ্ছে, সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপির ছয় জন এমপি শপথ নেবেন না। সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন।
কিন্তু লন্ডনে বসে ঢাকা থেকে যে খবর পাচ্ছি, তা সত্য হলে পরিস্থিতি অন্যরকম। বিএনপি নেতারা শর্ত সাপেক্ষে সংসদে যোগ দিতে চান। সেজন্য সরকারের সঙ্গে গোপন আলোচনা চলছে। শর্তগুলোর মধ্যে প্রধান শর্ত হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে প্যারোলে মুক্তিদান। গুজবটা সত্য বলে মনে হচ্ছে এই কারণে যে, শেখ হাসিনা এই নির্বাচনে আন্তরিকভাবেই চেয়েছেন বিএনপির জোট থেকে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী জয়ী হোক এবং সংসদে ক্রেডিবল বিরোধী দল গঠন করুক। তাতে নবনির্বাচিত সংসদের ক্রেডিবিলিটি বাড়ে। বিএনপি সংসদে আসুক এই ইচ্ছা এখনো তার আছে। অন্যদিকে এই নির্বাচনের বৈধতা কোনোরকমেই স্বীকার করা নয় এবং সংসদেও যোগদান নয়— এই ধরনের একটা জেদ ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি এতোদিন ধরে দেখাচ্ছে। তাতেও একটা পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বেগম জিয়াকে চিকিত্সা লাভের জন্য হাসপাতালেও পাঠাতে সম্মতি দিয়েছেন এবং বেগম জিয়াও সরকারের পছন্দ করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতে রাজি হয়ে সেখানেই চিকিত্সা নিচ্ছেন।
দুইদিকেই বরফ গলতে শুরু করেছে। সরকার চান দেশের দ্বিতীয় বড়ো দলটি সংসদে আসুক। তাতে সংসদের গণতান্ত্রিক ক্রেডিবিলিটি আরো বাড়বে। অন্যদিকে বিএনপির নেতারাও বুঝে ফেলেছেন তারা ঘরে বসে বাঘের মতো হুঙ্কার দিতে পারেন; কিন্তু তাদের অবস্থা এখন মানুষের মতো। আন্দোলনের হুমকি দিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না। কয়েকটি পশ্চিমা দেশও তাদের এই মর্মে পরামর্শ দিচ্ছেন। ঢাকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, চলতি মাসেই বিএনপির ছয়জন সংসদ সদস্য শপথ নেবেন এবং খালেদা জিয়াও প্যারোলে মুক্তি পাবেন। লন্ডনে পলাতক তারেক রহমান আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপসের তীব্র বিরোধী ছিলেন। এখন হাঁকডাকে কোনো কাজ হবে না বুঝতে পেরে শির নত করেছেন। বিএনপি সংসদে গেলে এবং বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেলে দেশের রাজনীতিতে একটা ইতিবাচক ঘটনা ঘটবে। মুশকিলে পড়বেন ড. কামাল হোসেন ও এরশাদ সাহেব। বিএনপি সংসদে অনুপস্থিত থাকাতে এরশাদ সাহেব কখনো বরের ঘরের পিসি এবং কখনো কনের ঘরের মাসির ভূমিকায় চতুর অভিনয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই সুযোগ তার থাকবে না। যিনি ঘরের রাজনীতিতে ভাই আর স্ত্রীর সঙ্গে নারদ-মুনির খেলা খেলতে পারেন, তিনি বাইরের রাজনীতিতেও একই খেলা খেলছিলেন। বিএনপি সংসদে এলে সংখ্যায় তারা যত কম হোক, এরশাদ সাহেবের এই খেলার অবসান হবে। তার অবস্থা হবে ত্রিশঙ্কু মহারাজের মতো। এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির একমাত্র ভরসা বেগম রওশন এরশাদ। এই মহিলা নেতৃত্বে থাকলে জাতীয় পার্টি সংসদে একটি ভারসাম্যের অবস্থানে থাকতে পারবে।
বিএনপি সংসদে গেলে ড. কামাল হোসেনের অবস্থা হবে “না ঘরকা, না ঘাটকা।” তিনি এরশাদ সাহেবের ঘোর বিরোধী; কিন্তু তাদের রাজনীতি অভিন্ন। এরশাদ সাহেব আওয়ামী লীগের বন্ধু এবং শত্রু দুই-ই। দশম সংসদে ছিলেন আওয়ামী সরকারের অংশ এবং বিরোধীও। ড. কামাল হোসেনও তাই। তিনি এখনো নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধুর অুনসারী বলে জোর গলায় দাবি করেন, বাস্তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দল ও তার আদর্শবিরোধী জোটের তিনি বর্তমান নেতা। তিনি নিজেকে জাতীয় নেতা ভাবেন; কিন্তু দলীয় নেতা হওয়ারও যোগ্যতা দেখাতে পারছেন না। তার ভাঙা দলের দুইজন সংসদ সদস্যও তার নিদের্শ অমান্য করে শপথ পাঠ করেছেন। নিজের দলে যার কর্তৃত্ব নেই, তিনি জাতীয় রাজনীতিতে কী করে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন তা আমি জানি না। বিএনপির ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতিতে তিনি আসলে “শো বয়।” বিএনপি সংসদে গেলে এবং বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেলে বিএনপির তাকে আর প্রয়োজন হবে কী? তখন তার অবস্থা হবে পিটার প্যানের মতো। এখন তবু বক্তৃতা দেওয়ার মঞ্চ এবং শ্রোতা দুই পাচ্ছেন। পরিস্থিতি পাল্টে গেলে তা আর পাবেন কি? তাকে আবার রাজনৈতিক বনবাসে যেতে হবে। সম্ভবত এবার স্থায়ীভাবে। বিএনপিকে আমি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য “ক্রেডিবল অপোজিসন” মনে করি না। কারণ এই রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক আদর্শের এরা বিরোধী। বাংলাদেশের দরকার একটি ক্রেডিবল গণতান্ত্রিক বিরোধী দল; কিন্তু এই ধরনের দল যতদিন গড়ে না ওঠে ততদিন মন্দের ভালো বিএনপির সংসদে অবস্থান দরকার। সুযোগ-সন্ধানী ও নীতিহীন জাতীয় পার্টি বা গণফোরাম রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম।
এজন্যই আমি বিএনপির নির্বাচন বর্জন কিংবা সংসদ বর্জনের নীতি সমর্থন করতে পারিনি। রাজনীতিতে সকল অবস্থাতেই নেগেটিভ পলিসি অনুসরণ না করে উচিত পজিটিভ পলিসি অনুসরণ করা। ১৯৪৬-৪৭ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদে অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন মাত্র একজন। কমরেড জ্যোতি বসু। সেই জ্যোতি বসু পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ত্রিশ বছরের বেশি রাজত্ব করেছেন।
বিজেপির ইতিহাসও তাই। ইন্দিরা-রাজীব গান্ধীর আমলে ভারতের লোকসভায় বিজেপির সদস্য ছিল মাত্র দুই জন। আর সেই ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি এখন দিল্লির সিংহাসনে আসীন। বাংলাদেশে বিএনপি বিদ্বেষের রাজনীতি নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে আসুক। মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধ রাজনীতির অনুসরণ বন্ধ করুক। ঘাতক রাজনীতির অনুসারী জামায়াতের সঙ্গ ও সখ্য বর্জন করুক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি তা হলে সুস্থতা ও স্থায়িত্ব পাবে। বিএনপিও তার অস্তিত্ব ফিরে পাবে। এজন্যই প্রার্থনা করছি— চলতি মাসে বাংলাদেশে রাজনীতির মোড় ফেরা সম্পর্কে যা রটছে— তা যেন গুজব না হয়ে সত্য খবর হয়।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি