সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান কি রাজনৈতিক বেইমান
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 6 April, 2019 at 8:44 PM

সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান কি রাজনৈতিক বেইমানহারাধনের সবেধন নীলমণি দুই ছেলেও শেষ পর্যন্ত হারাধনকে ত্যাগ করলেন। গণফোরামের দুই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত সুলতান মনসুর এবং মোকাব্বির খান একজন আগে, আরেকজন পরে দলের ও জোটের নির্দেশ অমান্য করেছেন। তারা দলের ও জোটের হুকুম মানেননি। কিন্তু তাদের নির্বাচকমণ্ডলীর রায় মাথা পেতে নিয়েছেন। আমি দু'জনকেই অভিনন্দন জানাই। সুলতান মনসুর নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখাননি। সংসদের সদস্য পদে শপথ গ্রহণ করেছেন। মোকাব্বির খান একটু বিলম্ব করে সম্প্রতি শপথ নিয়েছেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে দু'জনকেই চিনি। আওয়ামী লীগ থেকে সুলতানকে একসময় সরিয়ে দেওয়া হলেও তিনি বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করতে পারেননি। আমার মনে হয়, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন পাওয়ার আশা না থাকাতেই সুলতান বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হওয়ার দাবিদার ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম পার্টিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। যেহেতু নির্বাচনে গণফোরাম ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল, সেহেতু তিনি ঐক্যফ্রন্টেরও প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে দেখা গেছে, তিনি জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে বক্তৃতা শেষ করেছেন। তাতে ঐক্যফ্রন্টের বিএনপি নেতারা তার ওপর বিরক্ত হয়েছেন। তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন, সে জন্য তলে তলে চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটদাতাদের বিপুল অংশের ভোটে তিনি জিতে গেছেন। তার দায়বদ্ধতা এখন ভোটার-জনগণের কাছে। বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার আদর্শের পিঠে ছুরিকাঘাতে উদ্যত জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কাগুজে দলের প্রতি নয়।

কাক অতি চালাক। তার বাসাতেই কোকিল তার বাচ্চা প্রসব করে। অতি চালাক কাক ওই বাচ্চাকে নিজের শাবক মনে করে অতি যত্নে বড় করে। কোকিলছানা একটু বড় হয়ে ডানা মেলতে পারলেই তার কোকিল-মায়ের কাছে চলে যায়। অতি চালাক কাক তখন হয়তো নিজের নির্বুদ্ধিতাকে ধিক্কার দেয়। গত সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সুলতান মনসুর এই কোকিলছানার কাজটিই করেছেন। গণফোরাম তাকে দল থেকে বহিস্কার করেছে। সুলতান মনসুরের জন্য এটা শাপে বর। কাকের বাসা থেকে তিনি কোকিলের দলে ফিরে এসেছেন। নামসর্বস্ব এবং চক্রান্তকারী একটি দল থেকে তিনি জনগণের মুক্ত মোহনায় স্থান নিয়েছেন। নির্বাচন চলাকালে আমি সুলতান মনসুর সম্পর্কে এই আশাবাদই ব্যক্ত করেছিলাম, তিনি ঘরে ফিরবেন। তিনি সাময়িকভাবে পথ হারিয়েছিলেন, পথভ্রষ্ট হননি।

গণফোরামের নির্বাচিত দ্বিতীয় এমপি মোকাব্বির খান আমার অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ আপনজন এবং ছোট ভাইয়ের মতো। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী। লন্ডনে তার দীর্ঘকালের বাস এবং সেই সুবাদে তার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। প্রবাসীদের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনে তার সঙ্গে কাজ করেছি এবং পোর্টস মাউথ ও লন্ডনের দুটি বিশাল সমাবেশে যোগ দিয়েছি। দুটি সমাবেশই ছিল প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত এবং মোকাব্বির খান কর্তৃক আয়োজিত। প্রবাসীদের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনে লন্ডনে তার নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ছিল। ড. কামাল হোসেন এই ভোটাধিকার আদায়ের মামলায় আইনজীবী। পোর্টস মাউথ ও লন্ডনে এই ভোটাধিকার সংক্রান্ত সভায় ড. কামাল হোসেন ছিলেন প্রধান বক্তা। সব দলমতের মানুষই এই সভায় এসেছিল।

আমি দেশে কিংবা বিদেশে ড. কামাল হোসেনের সভায় কখনও বেশি জনসমাগম দেখিনি। কিন্তু মোকাব্বির কর্তৃক আয়োজিত সভায় প্রচুর জনসমাগম দেখেছি। ড. কামাল হোসেন প্রবাসীদের ভোটাধিকার আদায়ের মামলায় একজন আইনজীবী ছিলেন। মামলায় প্রবাসীদের জয়লাভের পর মোকাব্বির লন্ডনের ইয়র্ক হলে ড. কামাল হোসেনকে এক সংবর্ধনাদানের আয়োজন করেন। এই সংবর্ধনা সভাতেও দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল।

মোকাব্বির তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের অনুসারী। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ছিলেন বলেই মোকাব্বির তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এবং শিগগিরই তার দলীয় আনুগত্য নেতার প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যে পরিণত হয়। লন্ডনে মোকাব্বির ড. কামালের একমাত্র খুঁটি হয়ে ওঠেন। তাকে বলা হতো ড. কামালের 'একমাত্র খলিফা'।

ড. কামাল যখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দখল করতে না পেরে প্রথমে গণফোরামকে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনার একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গঠন করে কিছুদিনের মধ্যে আলাদা রাজনৈতিক দলে রূপান্তর দ্বারা আওয়ামী লীগে ভাঙন ধরানোর চেষ্টায় ব্রতী হন, তখন মোকাব্বির অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হন এবং আমার বাসায় ছুটে আসেন। তখন তিনি লন্ডনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করেন। মোকাব্বির আমাকে বলেন, দেশে এখন বিএনপি ও জামায়াতের মতো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজত্ব চলছে। এ সময় দেশের স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরের একমাত্র আশা আওয়ামী লীগ। এই দুর্দিনে আওয়ামী লীগ ভাঙা হলে স্বাধীনতার শত্রুদের সাহায্য করা হবে এবং দেশের সর্বনাশ হবে। সুতরাং শেখ হাসিনা ও ড. কামালের মধ্যে মনোমালিন্য মিটিয়ে আওয়ামী লীগের ঐক্য রক্ষা করতেই হবে।

তাকে বলেছি, আমি একজন নগণ্য সাংবাদিক। আমার পক্ষে কি সম্ভব এই দুই নেতাকে বুঝিয়ে কোনো সমঝোতায় আনায়? মোকাব্বির বললেন, আপনি দু'জনের সঙ্গেই পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠ। আপনার চেষ্টা ব্যর্থ নাও হতে পারে। আপনি ড. কামালের সঙ্গে প্রথমে আলাপ করুন। আমি তাকে আপনার বাসায় নিয়ে আসব। ড. কামাল তখন লন্ডনে। আমার সঙ্গে মোকাব্বির কথা বলার দু'দিন পরেই ড. কামালকে আমার বাসায় নিয়ে আসেন। আমি তার সঙ্গে এক ঘণ্টার ওপর আলোচনা করি।

আমি তাকে বলেছি, আপনি নাকি গণফোরামকে আলাদা রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করতে যাচ্ছেন, দলের উদ্বোধনের দিনও স্থির করে ফেলেছেন। ওই উদ্বোধনে ড. ইউনূস, ড. আনিসুজ্জামান, আবুল মাল আবদুল মুহিত, নুরুল ইসলাম নাহিদসহ বিভক্ত মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি ও মোজাফ্‌ফর ন্যাপের কয়েকজন বিশিষ্ট নেতাও যোগ দেবেন। গুজব, তাদের অনেকে নবগঠিত দলে যোগও দিতে পারেন। যদি তা হয়, তাহলে স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরে ভাঙন ধরবে এবং '৭১-এর পরাজিত শক্তি ক্ষমতায় স্থায়ী হয়ে বসবে। আমার একান্ত অনুরোধ, আপনি আওয়ামী লীগে ফিরে যান। আপনি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত অনুসারী ছিলেন। কোনো কারণেই এই দুর্দিনে তার দল ভাঙবেন না।

এই বৈঠকে মোকাব্বিরও উপস্থিত ছিলেন। আমার অনুরোধের জবাবে ড. কামাল বললেন, 'শেখ হাসিনা আমাকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। কোনো পরামর্শ শোনেন না। তার সঙ্গে আমার রাজনীতি করা অসম্ভব।' আমি বলেছি, আপনাদের মধ্যে রাজনীতি-সংক্রান্ত মতান্তর হতেই পারে। কিন্তু শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আপনাকে ডাকেন বিগ আঙ্কেল এবং আমি জানি, দু'জনেই আপনাকে শ্রদ্ধা করেন। আমার বিশ্বাস, আপনাদের দু'জনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি আমি মেটাতে পারব। আপনি সম্মানের সঙ্গে আওয়ামী লীগে ফিরে যেতে পারবেন। আমাকে মাত্র সাতটা দিন সময় দিন। আমাকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় ও সুযোগটা দিন।

কামাল সাহেব বললেন, 'আমি আগামীকালই ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি। আর তিন দিন পরেই রাজনৈতিক দল হিসেবে গণফোরাম আত্মপ্রকাশ করবে। ঘোষণা দেওয়া হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ থেকেও কিছু প্রবীণ নেতা গণফোরামে যোগ দেবেন। আমি তাদের কী বোঝাব?' আমি তাকে একটু নরম হতে দেখে বলেছি, নতুন দল গঠন করে স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরে এই নাজুক মুহূর্তে ভাঙন ধরানোর চেয়ে এই শিবিরের ঐক্য রক্ষা করাই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে আপনার কর্তব্য। আপনি কোনো কারণেই এই কর্তব্যচ্যুত হতে পারেন না। আমাকে দয়া করে সাতটা দিন সময় দিন। আমি শেখ হাসিনার সঙ্গে একটু কথা বলে দেখি।

ড. কামাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাবলেন। তারপর বললেন, 'অল রাইট, আপনার অনুরোধ রাখলাম। রাজনৈতিক দল হিসেবে গণফোরাম গঠনের ঘোষণা সাত দিন পিছিয়ে দিলাম। দেখবেন মীমাংসাটা যেন সম্মানজনক হয়।' আমি তাকে কথা দিলাম, শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে এবং মোকাব্বিরকে ফলাফল জানাব। আমি প্রথমেই শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা না বলে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সঙ্গে কথা বলেছি। তখন আমি অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার বাণীর নিয়মিত কলামিস্ট। শেখ সেলিম আমাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, আপনি সরাসরি শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলুন।

আমার এই প্রচেষ্টার কথা বাংলার বাণীতে প্রথম পৃষ্ঠায় বিরাট করে ছাপা হয়েছিল। খবরের সঙ্গে টেলিফোনের রিসিভার হাতে আমার একটা ছবিও ছাপা হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে দেরি না করে টেলিফোন করেছি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রিসিভার তুলেছেন। তাকে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে আমার যে কথা হয়েছে, তা জানালাম। তিনি তার স্বভাবসুলভ মৃদুস্বরে বললেন, 'তাকে আমরা আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার করিনি। তিনি স্বেচ্ছায় দল ছেড়েছেন। কিছুকাল যাবৎ তার দলবিরোধী কার্যকলাপের জন্য কোনো কৈফিয়তও চাওয়া হয়নি। তার জন্য আওয়ামী লীগের দরজা সবসময় খোলা। তার সম্মান আমরা অক্ষুণ্ণ রাখব।'

তার কথাটা ডা. কামাল হোসেনকে জানাতে যাব, শুনি গণফোরামের রাজনৈতিক দল হিসেবে উদ্বোধন হয়ে গেছে। সভায় ড. ইউনূস দেশের মানুষকে 'স্বপ্নের পোলাও' খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ড. কামাল হোসেন আমাকে দেওয়া কথা রাখেননি। সাত দিন দূরের কথা, তিনি দু'দিন সময়ও আমাকে দেননি। তার আগেই দল গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন এবং দলের উদ্বোধন করেছেন। তারপর তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আর প্রয়োজনবোধ করিনি।

কামাল সাহেবের প্রতি মোকাব্বিরের আনুগত্য ও সম্পর্ক এত গভীর ছিল যে, তিনি গণফোরামে থেকে যান এবং যুক্তরাজ্যে দলের শাখা গঠন করেন। আমি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি জবাব দিয়েছেন, 'ড. কামাল হোসেনকে আমি নেতা মেনেছি। তিনি নতুন দল গঠন করেছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছাড়েননি। আমি তাই তার সঙ্গে আছি।' তিনি যে আমাকে মিথ্যা বলেননি, তার প্রমাণ পেয়েছি এবারের সাধারণ নির্বাচনে।

মোকাব্বির ঐক্যফ্রন্টের নামে কিন্তু গণফোরামের প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে নামেন এবং জয়ী হয়েছেন। তিনি গণফোরামের প্রতীক এবং ড. কামাল হোসেনের ছবি তার নির্বাচনী প্রচারপত্রে ব্যবহার করেছেন। বিএনপির ধানের শীষ ব্যবহার করেননি। গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী এবং অপর নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু দু'জনেই তাদের নির্বাচনী প্রচারপত্রে ধানের শীষ ও খালেদা জিয়ার ছবি ব্যবহার করেছেন এবং শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। ড. কামাল হোসেনও যদি ধানের শীষ ও খালেদা জিয়ার ছবি নিয়ে নির্বাচনে নামতেন, তিনিও যে পরাজিত হতেন, তাতে আমার সন্দেহ নেই।

ড. কামাল হোসেনকে ধন্যবাদ দিই, তিনি বিএনপিকে নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছেন- এটা তার সাফল্য। কিন্তু তাদের জয়ী সদস্যদের যে সংসদে বসাতে পারেননি, এটা তার ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় বহনের আবশ্যকতা মোকাব্বিরের নেই। ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল যুক্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য। নির্বাচনের পর কী হবে কিংবা নির্বাচনে ফ্রন্ট জয়ী হলে পরবর্তী পর্যায়ে কী হবে, কে সরকার গঠন করবেন, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন- সবচেয়ে বড় কথা ঐক্যফ্রন্ট থাকবে কি-না সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। বরং ফ্রন্টের ভেতর থেকে পরস্পরবিরোধী কথা শোনা গেছে।

নির্বাচনের পর ড. কামাল হোসেনই আভাস দিয়েছিলেন, ফ্রন্টের জয়ী প্রার্থীরা সংসদে শপথ নেবেন। পরে সম্ভবত বিএনপির চাপে মত বদলান। তার এই ভোল পাল্টানোর জন্যই মোকাব্বির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রথমে শপথ গ্রহণ করতে পারেননি। তার নেতার সুমতি ফেরার জন্য অপেক্ষা করেছেন। আমাকে টেলিফোন করে বলেছেন, 'গাফ্‌ফার ভাই, আপনি আমার নেতাকে সদুপদেশ দিয়ে একটা লেখা লিখুন। সংসদে যোগ দেওয়ার পক্ষে তার আগের অভিমতই সঠিক ছিল। এখন বিএনপির চাপে সংসদ বর্জন করলে শুধু দেশের ক্ষতি করা হবে না, দেশে গণতান্ত্রিক ধারারও ক্ষতি করা হবে।'

মোকাব্বির আরও বলেছেন, 'দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমরা তাদের কাছে দায়বদ্ধ। দলীয় স্বার্থে আমরা সেই দায়বদ্ধতা এড়াতে পারি না।' আমি তাকে বলেছি, কামাল সাহেবের সঙ্গে আমার এখন যা সম্পর্ক, তাতে কোনো ভালো কথা লিখলেও তার কাছে তেতো লাগবে। মোকাব্বির শেষ পর্যন্ত সুলতান মনসুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। আমার মতে, তারা জনগণের রায়কে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। ড. কামাল যে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে দলের সংকীর্ণতা ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারেননি, সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির তা পেরেছেন।

সুলতান মনসুর ও মোকাব্বিরকে এখন রাজনৈতিক বেইমান বলে দুর্নাম রটানো হচ্ছে। একটু বিশ্নেষণ করলে দেখা যাবে, নিজেদের সারা জীবনের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে তারা বেইমানি করেননি। করেছেন তাদের নেতা। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী আদর্শের পিঠে ছুরি মেরে এই আদর্শের শত্রুদের সঙ্গে তিনি হাত মিলিয়েছেন। যে আওয়ামী লীগ তাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, তার সঙ্গে বেইমানি করেছেন। জনগণ তার রাজনৈতিক বেইমানি ধরে ফেলায় এখন চিৎকার করে বলতে শুরু করেছেন, 'আমি এখনও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী।' এটা অনেকটা শরৎচন্দ্রের টগর বোস্টমীর মতো কথা- 'মিনসের সঙ্গে ২০ বছর ঘর করছি, কিন্তু হেঁসেলে ঢুকতে দেইনি।'

সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান বরং তাদের দলীয় নেতাকে পদঙ্খলন ও রাজনৈতিক বেইমানি থেকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। পারেননি। তারা তাদের পুরনো রাজনৈতিক আদর্শের পথে ফিরতে চাচ্ছেন আর ড. কামাল হোসেন কাকের ময়ূর পুচ্ছ ধারণের মতো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আলখাল্লা গায়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতির শিবিরে রয়ে গেছেন। মোকাব্বির তরুণ রাজনীতিক হয়েও যে প্রশংসনীয় কাজটি করেছেন, সে কাজটি একসময় করেছিলেন ভারতের প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ বাবু। অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে গঠিত বিজেপি সরকারের মেয়াদ শেষ হলে ভারতীয় লোকসভার যে নির্বাচন হয়, তাতে কংগ্রেস জোট জয়ী হয় এবং নতুন মন্ত্রিসভার প্রধান হন ড. মনমোহন সিং। ভারতের দুই কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম মোর্চা নির্বাচনে কংগ্রেসী জোটে ছিল এবং নতুন সরকারে কোনো পদ না নিলেও তাকে সমর্থনদানের সিদ্ধান্ত নেয়। সিপিএম নেতা সোমনাথ বাবু লোকসভার স্পিকার নির্বাচিত হন।

এরপর কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে বাম মোর্চার মতানৈক্য দেখা দেয়। বাম মোর্চা সরকারের ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং সিপিএম সোমনাথ বাবুকে স্পিকার পদে ইস্তফাদানের নির্দেশ দেয়। সোমনাথ বাবু এই দলীয় নির্দেশ মানেননি। দল থেকে এই প্রবীণ নেতাকে বহিস্কার করা হয়। সোমনাথ বাবু বলেন, 'যে মুহূর্তে আমি স্পিকার পদে শপথ নিয়েছি, সেই মুহূর্তে দলনিরপেক্ষ হয়ে গেছি। দলীয় নির্দেশ মান্য করার চেয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং গণতন্ত্র রক্ষায় দায়িত্ব পালন করা আমার প্রধান কর্তব্য।' ব্রিটেনের রাজনীতিতেও এ ধরনের উদাহরণ আছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রক্ষায় সহায়ক নয়, বরং তার শত্রুদের তিনি মিত্র ও সহযোগী। তার এই রাজনৈতিক বিচ্যুতি ও স্বাধীনতার আদর্শের সঙ্গে বেইমানির সঙ্গে যুক্ত থাকতে না চাইলে সুলতান কিংবা মোকাব্বিরকে বেইমান আখ্যা দেওয়া যাবে না। বলা যাবে দেশপ্রেমিক। ইতিহাস কাদের বেইমান বলে চিহ্নিত করে, তা কিছুদিন অপেক্ষা করলেই জানা যাবে।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি