শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কৌশলে পরিবর্তন প্রয়োজন
আবু আহমেদ
Published : Monday, 13 November, 2017 at 9:05 PM

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কৌশলে পরিবর্তন প্রয়োজনশুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গারা স্বদেশভূমি রাখাইনে ফেরত যেতে পারবে ভাবলে বাংলাদেশ ভুল করবে। মিয়ানমারের মিলিটারি এবং ওখানকার বৌদ্ধ সহযোগীরা রোহিঙ্গাদের মেরে-কেটে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে ফেরত নেওয়ার জন্য? তাদের উদ্দেশ্যই ছিল এদের বাংলাদেশে পাঠানো। এবং মিয়ানমার এটাও বুঝে যে প্রথম দিকে শোরগোল হবে, তারপর সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। একপর্যায়ে রোহিঙ্গা ইস্যু হয়ে পড়বে একটা ভুলে যাওয়া ইস্যু। রোহিঙ্গাদের শুধু বাংলাদেশে যেতে হবে বললে ওরা বাংলাদেশে আসত না। ওদের গুলি করে মারা হয়েছে, ওদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা নিরুপায় জনগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত সীমান্তের ওপারে যেখানে আশ্রয় পাবে ভেবেছে, সেখানে আশ্রয়ের জন্য এসেছে। তাদের তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক সাড়া যতটা প্রয়োজন ততটাই হয়েছে। এর থেকে বেশি কিছু আশা বাংলাদেশ করতেও পারে না। আজকে রাখাইনে যা কিছু ঘটছে এবং ঘটেছে তা হলো মানবতার চরম লঙ্ঘন। শুধু ভাষা ও ধর্মের কারণে একটা নৃগোষ্ঠীকে তাদের স্বদেশভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। বিশ্ব শুধু কিছু ত্রাণ দিয়ে রোহিঙ্গাদের ক্ষতকে উপশম করতে চাইলে সেটাও হবে বিশ্ববিবেকের বিরুদ্ধে চরম অপমান। ন্যায়টা হবে মিয়ানমারকে বাধ্য করা যে তোমরা এটা করতে পারো না। তোমাদের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। কোনো দেশই ধর্ম-ভাষার ভিত্তিতে তার নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে পারে না, যেটা মিয়ানমার এতকাল করে আসছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের নাগরিকত্বকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অথচ আজকে মিয়ানমার বলতে চাইছে—যাদের কাছে কাগজপত্র আছে, তাদের ফেরত নেওয়া হবে। কিসের কাগজ? যে জাতির ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের দেশছাড়া করা হয়েছে, তারা কোথায় কাগজ পাবে! যাদের নাগরিকত্বই দেওয়া হলো না বা যাদের নাগরিকত্ব আগে ছিল, পরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তারা কোথায় কাগজপত্র পাবে? কোনো মানুষই সাধে আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেয় না। মিয়ানমারের উদ্দেশ্যই হলো রাখাইন রাজ্যকে মুসলিমশূন্য করা এবং ওই শূন্যস্থানে তাদের কথিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা। মিয়ানমারের এক অপকৌশল হলো, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা। তারা যদি কিছু রোহিঙ্গাকে নেয়ও তাহলে কি তাদের আগের ঘরবাড়িতে ফিরতে দেবে? এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়েছে যাদের মিয়ানমার ফেরত নিতে চাচ্ছে, তাদের জন্য মডেল বস্তি বানানো হচ্ছে। আনান কমিশনের কথা বলা হচ্ছে। মিয়ানমারের এই কমিশনের সুপারিশের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহবোধ থাকলেও তারা রোহিঙ্গাদের ওপর এই অত্যাচার করত না। তাহলে এটা কি পরিষ্কার নয় যে আনান কমিশনের সুপারিশের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই। তারা কি একবারও বলেছে যে তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেবে? আর কফি আনান কমিশনের মূল সুপারিশের মধ্যে নাগরিকত্বের বিষয়টি অন্যতম ছিল। এ কথাও ভাবার কোনো কারণ নেই যে অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের প্রতি নরম; বরং এই মহিলা আরো জঘন্য। রোহিঙ্গারা যতটুকু স্বাধীনতা পেত সু চি সেটাও কেড়ে নিয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশকে একটু গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে, তারা কিভাবে এ সমস্যা সমাধান করতে চায়। কোনো দিনই বিরোধীপক্ষ আমাদের কথা শুনবে না, আমরা যদি শুধু অনুরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি। আজকে বাংলাদেশ নিজেই বলছে মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক। আর ঠিক এ কথাই মিয়ানমার আন্তর্জাতিক মহলে বলে বেড়াচ্ছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের চমৎকার সম্পর্ক আছে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুটা দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করে সমাধান করা সম্ভব কিন্তু আসলে কি শুধু দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে? কেউ এটা বিশ্বাস করে না। আন্তর্জাতিক মহলও বাংলাদেশের অবস্থানটা দেখতে চায়। বাংলাদেশ শুধু দ্বিপক্ষীয়ভাবে এগোতে চাইলে তারা কিছু ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষান্ত হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশ যদি এই ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে এর একটা ন্যায্য সমাধান চায়, তাহলে সমাধানটা বাংলাদেশের পক্ষে যাবে বা বাংলাদেশ একটা ন্যায়সংগত সমাধান পাবে বলে আমরা মনে করি। সমস্যাটা মূলত বাংলাদেশেরই। সুতরাং বাংলাদেশকেই এ ইস্যুতে চিৎকার দিতে হবে। মিয়ানমারের এক মন্ত্রী ঢাকায় এলেন, পরে আমাদের এক মন্ত্রী ওদের দেশে গেলেন। এতে সমস্যা সমাধান হবে না, যদি না সেই এনগেজমেন্ট (ঊহমধংবসবহঃ) আন্তর্জাতিক সালিসের অংশ হয়। মনে রাখতে হবে, মিয়ানমারকে চাপে রাখতে হবে। এবং সেই চাপ বাংলাদেশ একা দিতে পারবে না। বাংলাদেশ যদি এমন ধারণা দেয় যে বিষয়টি নিয়ে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে আলোচনা হচ্ছে, তাহলে আন্তর্জাতিক মহল একটা ন্যায়নিষ্ঠ চাপ দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে যাবে। তারা ভাবতে শুরু করবে বিষয়টি বাংলাদেশ-মিয়ানমারের নিজদের ইস্যু মাত্র। আমাদের পরামর্শ, বাংলাদেশকে এই ইস্যুতে আরো শক্ত হতে হবে? কোমর শক্ত করে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশ শুধু ঢাকায় বসে কূটনীতিকদের প্রেস ব্রিফিং করে দায়িত্ব শেষ করলে কর্তব্য পালন হয়েছে বলে আমরা মনে করি না। বাংলাদেশের দূতকে রাজধানী থেকে রাজধানীতে ঘুরতে হবে। সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে প্রামাণ্য দলিল—কিভাবে কত নৃশংসতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গারা যদি দীর্ঘদিন বাংলাদেশে অবস্থান করে, তাহলে বিপদটা শুধু বাংলাদেশের জন্যই আসবে না, এটা অন্যদের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে। ভারত-চীন এই ইস্যুতে কতটা বাংলাদেশের পক্ষে থাকে, সেটাও নির্ভর করছে আমরা কোন অবস্থায় কিভাবে তাদের সমর্থন চাই। আমরা কি ভারত-চীনকে যথেষ্ট ব্যাখ্যা দিইনি? তাহলে তারা কি শুধুই অর্থনৈতিক স্বার্থে একটা দ্বৈত অবস্থান নিয়েছে? আমাদের সুপারিশ হলো অতি উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল শুধু এ ইস্যুতেই চীনে পাঠানো হোক। ওরা ভেটো দেওয়ার আগেই আমরা কেন ভেটো দেবে বলছি? আমরা কি চীনকে এ ইস্যুতে পক্ষে টানার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি? মনে রাখতে হবে সমস্যাটা বাংলাদেশেরই। সমস্যাটা অন্য কোনো দেশের না যে তারা আমাদের জন্য কাঁদবে। চীনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ আছে, আমরা তাদের গভীর সমুদ্রবন্দর করতে না দিলে কী হবে, রাখাইনে তারা ঠিকই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের পথটা করে নিচ্ছে। আমরা কি সোনাদিয়ায় চীনকে গভীর সমুদ্রবন্দর না করতে দিয়ে ভুল করেছি?
এসবও বাংলাদেশ নিজ স্বার্থে চিন্তা করবে বলে আশা করি।
লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি