শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
ভোটযুদ্ধে লুটেরা, ধর্মান্ধ শক্তি নির্বাসিত হোক
পীর হাবিবুর রহমান
Published : Thursday, 9 November, 2017 at 8:05 AM

ভোটযুদ্ধে লুটেরা, ধর্মান্ধ শক্তি নির্বাসিত হোকনানা জল্পনা-কল্পনা কখনো বা রাজনীতিতে মৃদুমন্দ ঢেউ আবার মাঝেমধ্যে ছন্দপতন ঘটিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর গুমোট হাওয়ার ভিতর দিয়ে হলেও ভোটযুদ্ধের পথে হাঁটছে দেশ। বিদায়ী চলমান বছর ছিল বহুল আলোচিত।
একদিকে সার্চ কমিটির মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ, অন্যদিকে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায় বাতিলের মধ্য দিয়ে তুমুল বিতর্কের ঝড়ে পতিত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নির্বাহী  বিভাগের সংলাপ শেষ পর্যন্ত গডড়য়েছে তার সহকর্মীদের অনাস্থায়। দুর্নীতিসহ নৈতিক স্খলনজনিত ১১টি অভিযোগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের একসঙ্গে কাজ না করার পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে লম্বা ছুটি নিয়ে তাকে চলে যেতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। যাওয়ার আগে তাকে ঘিরেও নানামুখী কথাবার্তার শেষ ছিল না। অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটি নিলেও যাওয়ার বেলায় তিনি বলেছিলেন, সম্পূর্ণ সুস্থ, আবার ফিরে আসবেন। তার এ বক্তব্যের পরই সুপ্রিম কোর্ট বিবৃতি দিয়ে পেন্ডোরার বাক্স খুলে দেয়। আপিল বিভাগের বিচারপতিদের তার সঙ্গে কাজ না করার অনীহা ও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ জনসম্মুখে চলে আসে। বাকি আরও সত্য জানার বিষয়টি মানুষ সময়ের হাতে ছেড়ে দিলে এ নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটে। তার ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার প্রাক্কালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম পরিষ্কার বলেছেন, প্রধান বিচারপতির নিজ আসনে ফিরে আসা সুদূরপরাহত। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা তার সঙ্গে যেখানে বসবেন না সেখানে তিনি ফিরে আসবেন কী করে? ইতিমধ্যে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশে সরকারকে আরও চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে টানাপড়েন এখনো শেষ হয়নি। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে সরকার পক্ষের রিভিউ আবেদন এখন সময়ের ব্যাপার। ১১ অক্টোবর রায়ের সার্টিফাইড কপি তারা হাতে পেয়েছেন।
 এক মাসের মধ্যে রিভিউ করার নিয়ম, বিলম্ব হলে সন্তোষজনক কারণ দেখিয়ে রিভিউ করা যায়। এ রিভিউয়ের প্রেক্ষিতে বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে না কি সংসদের হাতে বহাল থাকবে সেটিই নির্ধারণ হবে। এক্ষেত্রে সবার দৃষ্টি এখন সেদিকে। প্রধান বিচারপতি ঘিরে এ বছরে যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তা বিরল ঘটনা। সেনাশাসক এরশাদ জমানায় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন অষ্টম সংশোধনীর রায় বাতিল করে দিলেও এমন ঝড় ওঠেনি। বিদায়ী এ বছরে শারীরিকভাবে সুস্থ, কর্মঠ, পরিশ্রমী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিত্তথলিতে ছোটখাটো একটি অপারেশন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী অপারেশনের পর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না নেওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও এখনো তিনি কমনওয়েলথ সম্মেলনের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্ট থেকে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠক এমনকি দাফতরিক কাজও ঠিকমতো করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পায়ের সমস্যাসহ শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছেন। লন্ডনে তিন মাস চিকিৎসার জন্য কাটিয়ে দেশে ফিরলে সরকার তার প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে নেতা-কর্মীদের ঢল নেমেছিল, বেগম খালেদা জিয়াকেও অভ্যর্থনা জানাতে নেতা-কর্মীদের স্রোত নেমেছিল। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নেতা-কর্মীদের নিয়ে ফেনী হয়ে চট্টগ্রামে রাত যাপন করে কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বণ্টনে গেলে পথে পথে ঢল নামে। ফেনীতে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাডড়বহরে হামলার ঘটনা দেশবাসীকে বিস্মিত করেছে। এ হামলায় গণমাধ্যম কর্মীরাই মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন। দুই দলের পাল্টাপাল্টি দোষারোপ হলেও পরবর্তীতে সরকারি দলের নেতারা বলেছেন, তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছেন তারা মানুষের প্রত্যাশার রাজনীতির বিপরীত মেরুতেই শুধু বাস করেন না গণতন্ত্রের জন্য অশুভ তৎপরতায় লিপ্ত। এ হামলাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তি ন্যায্য পাওনা। হামলাকারীদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেও গণমাধ্যম পর্যন্ত বলতে পারেনি এরা কারা? কোনো কোনো গণমাধ্যম ছাত্রলীগ বললেও অধিকাংশই চিহ্নিত করতে পারেনি। এটি গণমাধ্যমেরও ব্যর্থতা। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এ যুগে গণমাধ্যমের কাছে এটা প্রত্যাশার নয়।

১৯৯৪ সালে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ট্রেনমার্চে নাটোরে যে গুলিবর্ষণ হয়েছিল ওই সময়ের সাদাকালো গণমাধ্যমেও বিএনপির হামলা বলে সত্য তুলে ধরা হয়েছিল। যাক বিএনপি সন্তুষ্ট, সরকার তাদের নির্বিঘ্নে যেতে আসতে দিয়েছে। তাদের সমর্থকরা পথে পথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমেছে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু বিএনপি মহাসচিব ভদ্র সজ্জন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পুলিশকে ধন্যবাদ দিলেও সরকারকে দেননি। বিএনপি হামলার জন্য সরকারি দলকে দায়ী করলেও এটা উপলব্ধি করা উচিত ছিল যে, সরকার না চাইলে বিমানবন্দর থেকে কক্সবাজারে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এত সমর্থককে পাশে পেতেন না। বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে অসংখ্য মামলা। বিগত দিনগুলোতে তারা যেমন হটকারী কর্মসূচি নিয়েছেন তেমনি সরকারের দমন-পীড়নের মুখেও পড়েছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মনে হয়েছে ভোটযুদ্ধের প্রচারণায় দুয়ার খুলতে শুরু হয়েছে। তবে এ হামলাকারীদের চিহ্নিত করা দরকার। সেই এরশাদ জমানা থেকে ফেনী এখনো এক মূর্তিমান আতঙ্কের জনপদ। নোয়াখালী থেকে ফেনীতে কাদের কর্তৃত্ব বিরাজ করছে, অতীতে কাদের ছিল দেশের মানুষ জানে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ নিয়মিত সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে যে ডিসিপ্লিন লাইফ মেইনটেইন করেন, নিয়মিত ব্যায়াম ও গলফ খেলেন তাতে নব্বইয়ের ঘর ছুঁই ছুঁই করেও শারীরিক ও মানসিকভাবে এখনো সুস্থ। তবে ইতিমধ্যে তিনিও সিঙ্গাপুরে একটি অপারেশন করে এসেছেন। হার্টে বাল্ব সংযোজনের পর চিকিৎসকরা যখন বলেছেন অপারেশন সফল তখন আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা ও শক্তি থেকে অনেক দূরে থাকলেও এরশাদই সেই শক্তির উৎস। শেখ হাসিনা মানে যেমন আওয়ামী লীগ, বেগম খালেদা জিয়া মানে যেমন বিএনপি, তেমনি এরশাদ মানেই জাতীয় পার্টি। এত ভাঙন, এত পীড়ন তবুও নিভু নিভু বাতির মতো জাতীয় পার্টি একটি উল্লেখযোগ্য আসন নিয়ে জ্বলে আসে এরশাদের নামের ওপর। একাত্তরের পাক হানাদার বাহিনীর দোসর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় দলীয়ভাবে তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারছে না। এক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনে প্রধান শক্তি যদি হয় আওয়ামী লীগ তাহলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যে বিএনপি এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী যে কোনো দলের মিত্র শক্তি হিসেবে এরশাদের জাতীয় পার্টিই বড় অংশীদার। এখন পর্যন্ত এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক গভীর। এরশাদ যখন সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তখন দফায় দফায় টেলিফোনে খোঁজ নিয়েছেন। ১৪ দলের নেতা জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাকে দেখতে গেছেন। এতে এরশাদ ও জাতীয় পার্টি অনেক খুশি। বলছিলাম এ বছরের অন্যতম আরেকটি আলোচিত বিষয় নির্বাচন কমিশন গঠন। সিইসি কে এম নূরুল হুদার নির্বাচন কমিশন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবে।

সব দলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও তার পরিবেশ নিশ্চিত করা এ নির্বাচন কমিশনের চ্যালেঞ্জ। সব দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে সিইসি মতবিনিময় করেছেন। সেই মতবিনিময় সভার একটিতে দাওয়াত পেয়েও আমি যাইনি বলে কিছু এসে গেছে এমনটি নয়। অগণিত সাধারণ মানুষের মতো আমিও বিশ্বাস করি আমাদের নির্বাচন কমিশন এমন স্বাধীন ও শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি তাদের পক্ষেই একটি গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। দেশের সবকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য প্রতিটি টকশোতে আমি কৃতিত্ব দিয়েছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তিনি চেয়েছিলেন বলেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে রুটিন ওয়ার্কের ফ্রেমে শেখ হাসিনার অন্তর্র্বতী সরকার ক্ষমতায় থাকবে। সংবিধান ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই সত্যকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজেদের অবস্থানের কারণে শেখ হাসিনার অন্তর্র্বতী সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে। তারা শুধু চাইবে নির্বাচনে যেন সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়। আমার বিশ্বাস এদেশে যতগুলো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তা সম্পন্ন হয়েছে কেবল নির্বাচন কমিশনের জন্য নয়, সেই সময়ের সরকারের আন্তরিকতার কারণে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তামাম দুনিয়ার কাছে প্রমাণ করবেন রাজনৈতিক সরকারের অধীনেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। অর্থাৎ সেনাশাসক এরশাদের সময় অকাল প্রয়াত কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ স্লোগান তুলেছিলেন, ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’। আর সেনাশাসন অবসানের পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সারা বাংলায় সেটি ছডড়য়েছিলেন। আগামী নির্বাচনে ভোট ও ভাতের লড়াইয়ের সংগ্রাম করা শেখ হাসিনা তারই প্রতিফলন ঘটাবেন। তিনি ইতিমধ্যে বলেছেন, জনমত জরিপে যারা উঠে আসবেন তাদেরই প্রার্থী করবেন। আগামী নির্বাচন হবে সবার অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। যে নির্বাচন গোটা দেশের মানুষ দেখতে চায়। সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা— সৎ, আদর্শিক, গণমুখী ও কর্মীবান্ধব নেতা-কর্মীদেরই তারা প্রার্থী করবেন। আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তের গৌরবে উদ্ভাসিত শক্তি ও অস্তিত্বকে কোনো দল অস্বীকার করবে না ভোটের লড়াইয়ে। জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের জনগণ যুদ্ধে গেছে, রক্তে কেনা এ দেশ আমাদের পবিত্র আমানত।

এখানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকেই লালন করে যারা এগিয়ে যাবেন জনরায় তাদের দিকেই ঝুঁকবে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নই ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও আমরা সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করার মধ্য দিয়ে খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও পুনর্বাসিতকরণের নির্লজ্জ বেহায়াপনা আমরা করেছি। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার নীতিহীনতা আমরা দেখিয়েছি। সামরিক শাসনের অবসানে শত শহীদের রক্ত ঝরলেও আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া দূরে থাক রাজনীতিকে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দিয়েছি। সংসদকে আমরা কার্যকর করতে পারিনি। সৎ, আদর্শিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সংসদে তুলে আনার পরিবর্তে নির্বাসনে পাঠিয়েছি। প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দায় এড়াতে পারে না। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিবিড় বিশ্লেষণে গণমানুষের দল আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশার ফর্দ অনেক বড়। এ দল জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই অর্জন করেনি, স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বই দেয়নি, মুক্তিযুদ্ধই পরিচালনা করেনি, গণতন্ত্রের সংগ্রামে মানুষকে অকাতরে জীবন দিতে দেখেছে। গরিবের দল আওয়ামী লীগ লুটেরাদের হাতে, দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী হতে পারে না। জনগণের গর্ভ থেকে যে দলের জন্ম সেই দল আওয়ামী লীগ জনগণের আকুতিকে উপেক্ষা করতে পারে না। বিএনপি নামের দলটি সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সামরিক শাসনের গর্ভ থেকে জন্ম নিলেও সংবিধানে কাটাছেঁড়া করলেও রাজনীতিকে মূল্যবোধহীন পথে টেনে নিলেও, একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসিত করলেও তার প্রতিষ্ঠাতা সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ভাঙনকবলিত ভঙ্গুর বিএনপিকে তারুণ্যোদীপ্ত ছাত্রদলের ওপর ভর করে বেগম খালেদা জিয়া রাজপথের আন্দোলনে তুলে এনেছিলেন। নতুন শক্তিতে শক্তিশালী করেছিলেন। কিন্তু একাত্তরের হানাদার বাহিনীর দোসর জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলন ও সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে যে অপশাসন দিয়েছিলেন, যেভাবে একুশের গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্রের কলঙ্কিত অধ্যায় জঙ্গিবাদের উত্থান এবং শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতার রক্তে এ জনপদ ভেসেছিল সেখানে সেই শাসন অপশাসনে পরিণত হয়েছিল। প্রতিহিংসার রাজনীতির আগুন জ্বলে উঠেছিল, এর প্রেক্ষিতে অর্থ লুণ্ঠন ও পেশিশক্তি বলে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার সব পথ রুদ্ধ হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগমন এবং জুলুম নির্যাতনে।

 টানা দুই বছরের দম বন্ধ গণবিরোধী অপশাসনের কবল থেকে জাতির মুক্তি ঘটেছিল দুই নেত্রীর মুক্তি, সেই সরকারের বিদায় ও ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের ভোটযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। আজকের বাংলাদেশে ফিরে তাকালে দেখা যায় কত মানুষ নিখোঁজ হয়েছে, গুম হয়েছে। সংসদ অকার্যকর হয়েছে, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি। জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায়নি। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়েছে গোটা দেশ ও সমাজ। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন ২৬ বছর ধরে বন্ধ রেখে তারুণ্যের শক্তিকে স্তব্ধই করা হয়নি, ছাত্র রাজনীতিকে আদর্শচ্যুত করাই হয়নি, গণরাজনীতিতে আদর্শিক নেতা-কর্মীর অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এ অঙ্গীকারে জাতির সামনে আসতে হবে যে, তারা আদর্শিক, সৎ, কর্মীবান্ধব ও গণমুখী নেতা-কর্মীদের দলীয় মনোনয়ন দেবেন। এমনকি সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে সব আঁতাত, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ভোটের ময়দানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হবেন। তারা আরও অঙ্গীকার করবেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় লুটেরা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রক ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত কোনো নেতা-কর্মীকে মনোনয়ন দেবেন না। সব দল আরও অঙ্গীকার করবে যে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে সব সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন এবং শক্তিশালী করবেন। প্রশাসনকে দলীয়করণ নয়, মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর ঢেলে সাজাবেন। মানুষের ক্রন্দন, অন্তহীন হাহাকার ও আকুলতাকে ঠাঁই দিয়ে ভোটযুদ্ধে সব লুটেরা গোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্বাসনে পাঠাবেন। আগামী ভোটযুদ্ধের মধ্যদিয়ে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ভিত্তিতে সৎ রাজনীতির আদর্শিক জায়গা থেকে গণতন্ত্রের সব দুয়ার খুলে দেবেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার রক্ষা করবেন।মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হোসেন তৃণমূল থেকে উঠে আসা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন রাজনৈতিক কর্মী। সাদামাটা সহজ সরল জীবন তার, সাদাকালো যুগের এ রাজনৈতিক কর্মী কৃষকের বন্ধু শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের এক স্মরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান হলে ঢাকায় বাডড়, এমপি হলে টাকার ছড়াছডড়, মন্ত্রী হলে বিদেশে বাডড়’। যথার্থ সত্য বলেছেন, যারা অবাধ লুণ্ঠন করেছে, যারা মধ্যস্বত্বভোগী দালাল কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতা অথবা যখন যারা ক্ষমতায় তাদের এমপি-মন্ত্রী হয়ে অগাধ বিত্তবৈভব ও বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়েছে তাদের মনোনয়ন সব দলকেই কেড়ে নিতে হবে।
 যারা ক্ষমতানির্ভর রাজনীতির ছায়ায় অনৈতিকভাবে দেশ-বিদেশে বিত্তবৈভব গড়েন, বিদেশে টাকা পাচার করেন, লুটপাটের মহোৎসবে মেতে ওঠেন, মানব কল্যাণের রাজনীতিকে রাজদুর্নীতির ভাগাড়ে পরিণত করেন— তাদের লাগাম টেনে ধরার অঙ্গীকার হতে পারে নির্বাচন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ জমানায় যারা বিতর্কিত হয়েছে, যেসব এমপি-মন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর অনেক অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, এলাকায় এলাকায় জনসেবকের বদলে শাসক হয়ে উঠেছেন, অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তাদের দলীয় মনোনয়ন থেকে দূরে রেখে সৎ, ভদ্র, বিনয়ী নেতা-কর্মীদের মনোনয়ন দান এখন আগামী নির্বাচনে সময়ের দাবি। স্বার্থ ও ভোগবিলাসের রাজনীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বরাবর সরব, আগামী নির্বাচনে আদর্শিক, গণমুখী, নির্লোভ প্রার্থী বের করা তার দায়িত্ব। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার এ দর্শনে তিনি কতটা বিশ্বাসী দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে তার উদাহরণ রাখতে পারেন। আমাদের রাজনীতির মহান পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিশ্রমী সংগ্রামমুখর জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে লালন বা সম্মান জানাতে গণবিরোধী লুটেরাদের মনোনয়ন দেওয়া যায় না। আগামী নির্বাচন সব দলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছে যে দেশ সেখানে সৎ আদর্শবান নেতা-কর্মীরা সংসদে আসবেন, সংবিধান, আইন, বিধিবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবেন না— এ আলোকে গণতান্ত্রিক আদর্শিক রাজনীতির দরজা এ ভোটযুদ্ধে খুলে দেওয়া যেতে পারে। অনেকের কাছে যা হাস্যকর অবাস্তব, রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে তা ঘটালেই হবে বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য। জনগণ বরাবর সৎ মানুষের শাসন চেয়েছে। সৎ, গণমুখী জনপ্রতিনিধি চেয়েছে। জনগণ ভুল করে না। ভুল তারাই করেন যারা রাজনীতির নামে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করেন। জনগণের ভালোবাসা আবেগ অনুভূতি আকাঙ্ক্ষাকে লালন করলে দেখবেন জনগণ বিমুখ করেনি।
রাষ্ট্রযন্ত্রে যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন তখন তাদের আনুগত্য ও অনুকম্পা লাভে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার, বিএনপির সময় বেগম খালেদা জিয়ার চেয়েও বড় বিএনপি হয়ে যায়।   এদের গরম নিঃশ্বাস সাধারণের কাঁধে এসে পড়ে, কখনো সখনো মিত্রশক্তির কাঁধেও পড়ে।   মিত্রকেও অভিমানে দূরে ঠেলে দেয়। এদের থেকে সতর্ক সজাগ থাকার দায়িত্ব আপনাদের।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।






সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি