শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
অক্টোবর বিপ্লবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
Published : Wednesday, 8 November, 2017 at 8:16 PM

অক্টোবর বিপ্লবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যআমাদের দেশের বাস্তব অবস্থাটা এখন কী? এখানে চালের দাম, এখানে চাষির দুঃখ, এখানে রাষ্ট্র কল-কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় ফেরত দেওয়া এবং এখানে কয়লা খননে পরিবেশ ধ্বংস ও মানুষের জীবন বিপন্ন করা—এই যে বাস্তবতা এসব বাস্তবতায় একটা কথা দাঁড়ায়। সেটা হলো আমরা একটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যে চরম রূপ, সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি।
আমাদের সংস্কৃতির ব্যাপারটা খুবই জরুরি। আমরা জানি যে সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। সংস্কৃতির মধ্যে আমাদের আত্মপরিচয় আছে, আমাদের জীবনাচার আছে, আচার-ব্যবহার আছে। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি আছে। সংস্কৃতির ভেতরেই আছে। আবার আছে আমাদের সংগ্রাম। মানুষের সংগ্রাম। বাঁচার জন্য, প্রকৃতির জন্য, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম, প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রাম—এ সবকিছু মিলে আমরা বলে থাকি যে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু আসল মেরুদণ্ড হচ্ছে তার সংস্কৃতি এবং এটা দেখা যাবে যে সভ্যতার চেয়েও এগিয়ে সংস্কৃতি এবং সংস্কৃতি স্থায়ীও। তাই আমরা সভ্যতার পতন দেখি, কিন্তু সভ্যতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি তো শেষ হয়ে যায় না। সেই সংস্কৃতির সৃষ্টিগুলো, সেই সংস্কৃতির অর্জনগুলো, সেই সংস্কৃতির মূল্যবোধগুলো রেখে যায় পরবর্তী ইতিহাসের জন্য। আমরা এই যে দেখব, সভ্যতার যে বিবর্তন হয়েছে, সেই বিবর্তনে নতুন নতুন পর্যায় পার হয়েছে এবং এই পর্যায়গুলোর সঙ্গে সংস্কৃতির যে সম্পর্ক সেটা অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক।
আমরা এটা জানি যে একসময় আদিম সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত ছিল। যখন মানুষ যা পেত তাই খেত, গাছ থেকে ফল খেত, পানি থেকে মাছ খেত। তখন উদ্বৃত্ত বলতে কিছু ছিল না এবং একটি সাম্যবাদী সমাজ ছিল। তার পরে সভ্যতা এগিয়েছে। সভ্যতার সেই অগ্রগতিতে পিতৃতান্ত্রিকতা এসেছে, ব্যক্তিমালিকানা এসেছে। আমরা দেখেছি যে দাস সভ্যতা বা সমাজ একসময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর সেটা ভেঙে সামন্ত সমাজ এলো, তারপর সেটা ভেঙে পুঁজিবাদী সমাজ এলো। এগুলো সবই অগ্রগতি। একটিকে ছাড়িয়ে আরেকটির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে মানুষ। কিন্তু ভেতরে এই যে দাস সমাজ, এই যে সামন্ত সমাজ, এই পুঁজিবাদী সমাজের ভেতরে যে একটি জিনিস আছে, সেটি হলো ব্যক্তিমালিকানা। এই তিন স্তরে এই ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এবং যে বিপ্লব ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯১৭ সালে, সেই বিপ্লব এই মালিকানার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছিল যে মালিক কি কয়েকজন থাকবে, মালিক কি ব্যক্তি থাকবে,  নাকি মালিক হবে সমাজ? উৎপাদন করে মানুষ একসঙ্গে  কিন্তু মালিকানা চলে গেছে অল্প কিছু মানুষের হাতে। এই যে মালিকানার সমস্যা, সেটা পুঁজিবাদ সমাধান করতে পারেনি। সে জন্যই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রয়োজন হয়েছিল। সে জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার। আমরা জানি, সমাজতন্ত্র  ৭২ বছর টিকে ছিল। আমরা আরো অনেক বিপ্লব দেখেছি। আমরা ফরাসি বিপ্লবের কথা জানি, আমরা শিল্প বিপ্লবের কথা জানি, আমরা আমেরিকার যুদ্ধের কথা জানি, আমরা আমাদের দেশে যে সিপাহি অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেটাও বৈপ্লবিক ছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেও আমরা বিপ্লব বলি। কিন্তু এই যে অক্টোবর বিপ্লব, সেই বিপ্লব সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা সেই বিপ্লব এই মালিকানার প্রশ্নটাকে নির্দিষ্ট করে দিতে চেয়েছিল। অন্য বিপ্লবগুলো ব্যক্তিমালিকানাকে রক্ষা করে চলে। কাজেই বিপ্লব আমাদের সামনে এনেছে যে প্রশ্ন সেই প্রশ্ন হলো মালিক কে হবে সম্পদের? মালিক কি শতকরা পাঁচজন মানুষ হবে, নাকি ৯৫ জন মানুষ হবে? এই সমস্যার সমাধান পুঁজিবাদ দিতে পারবে না, পারছে না এবং পুঁজিবাদী নৃশংসতা যে বর্বরতা, যে অমানবিকতা তা আজকে সর্বত্র উন্মোচিত হয়েছে। কাজেই এই বিপ্লবের যে তাত্পর্য সেটা হচ্ছে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে এই যে এই বিপ্লবের বিষয়টি সামনে নিয়ে এলো, সেটা হলো যে কোনটি বড়। মুনাফা বড়, নাকি মানুষ বড়? পুঁজিবাদ মুনাফাকে বড় করে দেখে, মুনাফা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। এবং সমাজতন্ত্র মানুষকে বোঝে, মনুষ্যত্বকে গুরুত্ব দেয়। এ জন্য সমাজতন্ত্রের যে সংগ্রাম সেই সংগ্রাম মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম এই যে মুনাফাখোরি সেটা ভাঙার সংগ্রাম। তাই এই জায়গাটিতে তাত্পর্য যে মালিকানা সামাজিক হবে। এইখানেই তাত্পর্য যে মুনাফা নয় মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুনাফা হলে কী হয়? মুনাফার রাজত্ব হলে কী হয়? তা আমরা বিশ্বে দেখেছি। আমরা দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছি। আজকে বর্বরতা দেখেছি এবং সমাজতন্ত্র থেকে সরে গেলে রাষ্ট্রের চেহারা যে কী দাঁড়ায় তা আমরা রাশিয়ায় দেখলাম। তা আমরা চীনে দেখেছি। বলা হয়, সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে। আসলে তা নয়। সমাজতন্ত্র থেকে রাষ্ট্রগুলো সরে গেছে এবং রাশিয়া যখন সমাজতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠা করল, তখন অন্য সব দুর্দশার মধ্যে প্রধান দুর্দশা হয়ে দাঁড়াল; যে নারীরা মর্যাদার আসনে ছিলেন, সেই নারীরা আবার আগের মতো নিজেদের দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হলেন। যে অধ্যাপক মর্যাদার সঙ্গে ছিলেন, সেই অধ্যাপক দেখা গেল ভিক্ষা করছেন। এই যে সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে পরিবর্তন, সেটা আমরা দুই ক্ষেত্রে দেখব। নারীর মর্যাদার ক্ষেত্রে দেখব, আর শিক্ষা ও জ্ঞানের যে মর্যাদা, সেখানেও দেখব। দুটিই ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। আমরা চীনে দেখেছি যে চীন যখন সমাজতান্ত্রিক ছিল তখন চীন সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন দিত। কিন্তু চীন যখন থেকে পুঁজিবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছে, তখন চীন মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে প্রাধান্য না দিয়ে তার জাতীয়তাবাদী স্বার্থ, তাদের পুঁজিবাদী স্বার্থ, তাদের মুনাফার স্বার্থকে বড় করে তুলেছে। সে জন্য আজকে মিয়ানমারে যে ঘটনা ঘটছে, যে গণহত্যা ঘটছে, সেখানে চীন মিয়ানমারের বর্বর শাসক, সামরিক শাসক, ফ্যাসিবাদী শাসক তাদের সমর্থন করছে। রাশিয়া তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মুনাফাকে প্রধান করে দেখেছে। মনুষ্যত্বকে প্রধান করে দেখেনি। রুশ বিপ্লবের তাৎপর্য এই যে মুনাফায় নয়, মনুষ্যত্বে বিশ্বাস করত। আমরা এটাই দেখেছি আমাদের এক আমলে। আমাদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব যে আমরা দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছি। এই সংগ্রামে সমাজতন্ত্রীরা ছিল, সঙ্গে জাতীয়তাবাদীরা ছিল। পার্থক্য ছিল—এই জাতীয়তাবাদীরা ছিল পুঁজিবাদী এবং সমাজতন্ত্রীরা ছিল ওই সামাজিক মালিকানায় বিশ্বাসী। কিন্তু নানা ঐতিহাসিক কারণে সমাজতন্ত্রীরা জয়ী হতে পারেনি। জাতীয়তাবাদীরা, পুঁজিবাদীরা জয়ী হয়েছে। এবং পুঁজিবাদীরা জয়ী হলে যে কি পরিণতি হয় তা আজকে আমাদের কাছে উন্মোচিত। এটিই হচ্ছে পরিণতি। এই বাংলাদেশে যা ঘটছে তা চিকিৎসা পণ্যে পরিণত হয়, শিক্ষা পণ্যে পরিণত হয়, নিরাপত্তা পণ্যে পরিণত হয়, তখন মানুষের কী দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ইতিহাসে আমরা বুদ্ধিজীবীদের দেখেছি। বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা দেখেছি। তাঁরা মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। আমরা পরবর্তী সময় দেখব নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে। এই যে অসাধারণ কবি, তিনি এই রুশ বিপ্লবের অনুপ্রেরণা, সেই তরুণ বয়সে কেমন করে অনুপ্রেরণাকে, এই মূল্যবোধকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করলেন, সেটাও আশ্চর্যের ঘটনা। তাঁর সেই গ্রহণ ক্ষমতা ছিল, যেটা শ্রেষ্ঠ মেধার প্রতীক, যেটা উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ছিল। শিক্ষা নেই, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কিন্তু গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে। সে জন্যই নজরুল বিপ্লবী হয়েছিলেন। তিনি বিদ্রোহ দিয়ে শুরু করেছিলেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্য দিয়ে বিপ্লবের পথে চলে গেছেন, সাম্যবাদের কথা বলেছেন, নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই বলেছেন, চাষি, মজুরের কথা বলেছেন। যে কুলি কলকাতার রেলস্টেশনে অপমানিত হচ্ছে, সেই কুলির অপমান দেখে তিনি বিশ্ব মানুষের, বিশ্ব মানবতার অপমান দেখেছেন এবং বলেছেন, এটা শেষ হবে, তা অবশ্যই শেষ হবে। ১৯১৭ সালে সেই যে বিপ্লবের প্রতিধ্বনি সেটি আমরা নজরুল ইসলামের মধ্য দিয়ে দেখি। কবিতার নাম, কবিতার বইয়ের নাম দিচ্ছেন সাম্যবাদী, সমস্ত বিপ্লবী কবিতা লিখেছেন। চাষিদের গান, শ্রমিকের গান, জেলের গান, ছাত্রদলের গান লিখেছেন এবং বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছেন। কিন্তু নজরুল ইসলামকেও থেমে যেতে হয়েছে। কেন থেমে যেতে হয়েছে? তাঁর বৈপ্লবিক যে আন্দোলন, যে আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর শুধু যে আত্মিক যোগাযোগ তা নয়, প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল এবং তিনি পরিবর্তিত হয়েছিলেন। তাঁর প্রথম পত্রিকার নাম ‘ধূমকেতু’ সাপ্তাহিক, যেটা বিপ্লব করবে। কিন্তু সেই বিপ্লব পরিষ্কার নয় কোন ধরনের বিপ্লব। তার পরেই পরবর্তী পত্রিকা বের করেছেন ‘লাঙল’ নামে এবং কলকাতায় তাঁর পত্রিকা অফিসের সাইনবোর্ডে একটি লাঙল টানিয়ে দিচ্ছেন। সেখান থেকে তিনি চলে যাচ্ছেন গণবাণীতে। এই অগ্রসর হচ্ছেন কিন্তু তার সঙ্গে তাল রেখে আন্দোলন, এই যে বিপ্লবের আন্দোলন, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন, কৃষকের আন্দোলন, সেটা এগোয়নি। ওদিকে দারিদ্র্য ছিল, ওদিকে পারিবারিক শোক ছিল, ওদিকে পুত্র শোক ছিল, ওদিকে নিজে অসুস্থ ছিলেন, সে জন্য একসময় তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই পরিণতিগুলো আমরা দেখি। আমরা দেখি বেগম রোকেয়াকে। বেগম রোকেয়া নারীমুক্তির প্রশ্নটাকে কেমনভাবে নিয়ে এসেছেন এবং চুম্বক কথাটা বলেছেন এখানে। তাঁর লেখায়ই আছে যে ‘ধর্মগ্রন্থ দেখে মনে হয় এটা যেন কোনো পুরুষের লেখা, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা’। এই কথা প্রায় ১০০ বছর আগে একজন নারী এই দেশ থেকে বলেছিলেন, চিন্তা করেছিলেন সেটা আমাদের মনে করায় যে তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। কিন্তু তিনি তো পর্দার আড়ালে থাকতেন, তিনি তো একাকী ছিলেন। তিনি নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় লিখতেন। কিন্তু তিনি তো আন্দোলন করতে পারেননি। কাজেই তাঁর আন্দোলন থেমে গেছে। এ জন্য আমরা দেখেছি আন্দোলন এগোচ্ছে না। আমাদের দেশে একটি বড় ট্র্যাজেডি ঘটেছে, মস্ত বড় ট্র্যাজেডি। প্রথম ট্র্যাজেডি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পরে, দ্বিতীয় ট্র্যাজেডি হলো ১৯৪৭ সালে দেশভাগ। সেই দেশভাগ সাংস্কৃতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, এমনকি প্রাকৃতিকভাবে আমাদের ভাগ করে দিয়ে যেভাবে আমাদের ক্ষতি করেছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতাটি আপনাদের মনে আছে যে শিশু তেলের শিশি ভেঙে ফেলেছে। বলছেন ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে শিশুর ওপর রাগ করো! তোমরা কি সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো তার বেলা?’ বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করছে। ইংরেজ প্ররোচনা দিয়েছে। কিন্তু কেমন করে ভিতরে সাংস্কৃতিকভাবে এই ভাঙাভাঙির ব্যাপারটা কাজ করছিল তার নানা দৃষ্টান্ত আমরা পাব। এবং একাত্তর সালে আমরা দেখেছি যে পাকিস্তানি হানাদাররা গণধর্ষণ করেছে। সেই রকম গণধর্ষণ আজ বাংলাদেশে চলছে। বাঙালি করছে। এখন পাঞ্জাবি হানাদার নেই। বাঙালি লোকেরা, বাঙালি যুবকরা নারী ধর্ষণ করছে, গণধর্ষণ করছে। এবং গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী। এই যেমন বাসে যাচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রূপা। তাকে একা বাসে পেয়ে তারা পাঁচজন মিলে ধর্ষণ করল চলন্ত বাসে। এ রকম ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। এ রকম ঘটনা ঘটবে বলে বাংলাদেশ স্বাধীন করিনি।
এ রকম ঘটনা ঘটবে বলে এই দেশে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দেয়নি। দুই লাখ নারী তাদের সম্ভ্রম হারায়নি। কিন্তু এটা এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা। শুধুই শিক্ষিত রূপা নয়, শিশু ধর্ষিত হচ্ছে এবং শিশুকে ধর্ষণ শেষে গলা টিপে মেরে ফেলা হচ্ছে। তার লিভার, তার অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব, তার কিডনি বের করে নেওয়া হচ্ছে। এই যে বীভৎসতা! এই বীভৎসতা শিখছে কী কারণে? যে যুবকরা গণধর্ষণ করছে তারাও দরিদ্র, তারাও শান্তিতে নেই, কারণ তাদেরও বাড়িতে মা-বোন আছে, কিন্তু তারা এ কাজ করছে কেন? তারা পুঁজিবাদের যে আদর্শ, সেই আদর্শে দীক্ষিত হচ্ছে। তারা মুনাফায় বিশ্বাস করে। এবং এই মুনাফা হচ্ছে ভোগের মুনাফা। এই মুনাফাকে যত বেশি ভোগ করা যায়, তত বেশি নিজেকে সে সুখী মনে করবে। সে জন্য তার আচরণ এবং যে হানাদার তার আচরণের পার্থক্য নেই। বরঞ্চ তার আচরণ হানাদারের চেয়েও খারাপ। দুটি একই জায়গা থেকে এসেছে। দুটি হচ্ছে পুঁজিবাদের দীক্ষায় দীক্ষিত। পুঁজিবাদের যে প্রতিনিধি,  পুঁজিবাদের যে সমর্থক, সেই সমর্থক তাদের সমর্থনের দ্বারা এই কাজ করছে।
যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মালিকানার সমস্যা, মালিকানার প্রশ্নের মীমাংসা হবে। সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে ব্যক্তিমালিকানার জায়গায়। যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মুনাফার জায়গায় মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই সামাজিক বিপ্লবের জন্য আমরা দীর্ঘকাল সংগ্রাম করছি। সেই সামাজিক বিপ্লব সম্ভব হয়নি। আমরা ১৯৭১ সালে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আশা করেছিলাম কিন্তু আজকে পুঁজিবাদীরা দখল করে নিয়েছে ক্ষমতা। পেটি বুর্জোয়ারা বুর্জোয়া হয়ে গেছে এবং যারা বুর্জোয়া হতে পারেনি, তারা বুর্জোয়া যে মানসিকতা, মুনাফার মানসিকতা তার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এবং সে জন্য এই নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ এগুলো উন্মোচিত করছে। আমরা পথের সন্ধান জানি। আমরা বিপ্লবের কথা জানি। আমরা ফরাসি বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আমরা প্যারিকমিউন থেকে শিক্ষা নিয়েছি, আমরা রুশ বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়েছি। এবং এটাও আমরা জানি যে এই বিপ্লবের সাংস্কৃতিক ভূমিকা সেটা কী অসামান্য ভূমিকা। রুশ দেশে বিপ্লব কখনোই হতো না, যদি সেই দেশের সাংস্কৃতিক মান এত উঁচু না হতো। তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি তাঁদের লেখার মধ্য দিয়ে বিপ্লবের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। তাঁরা গবেষণা করেছেন, তর্ক করেছেন এবং লেনিন ট্রটস্কির যে অসামান্য অবদান, সেই অবস্থানটা তুলনীয় হয় না। লেনিনের মতো দ্বিতীয় মানুষ তাঁর সময় পুরো ইউরোপে ছিলেন না। যেমন মার্ক্সের মতো সমান জ্ঞানী মানুষ আর কেউ ছিলেন না। বিজ্ঞানে হয়তো ছিলেন। কিন্তু সমাজ ক্ষেত্রে, সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁর দ্বিতীয়টি কেউ ছিলেন না। এই উচ্চতায় মার্ক্সবাদকে লেনিন প্রয়োগ করলেন। মার্ক্সবাদকে যদি লেনিন প্রয়োগ করতে না পারতেন তাঁর দেশে, তাহলে মার্ক্সবাদ একটি তত্ত্ব থাকত, একটি স্বপ্ন থাকত। একটি স্বপ্ন রাজ্যের, স্বর্গীয় কল্পনা বলে লোকে উপহাস করত। এই ধরনের কল্পনা আমরা আগেও পেয়েছি। ইউটোপিয়ার অনেক কথা আছে। কিন্তু যেটা লেনিন করেছেন সেটা হচ্ছে এই যে মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করে তাদের মধ্য দিয়েই বিপ্লব সংগঠিত করেছেন। এবং এই বিপ্লবের শক্তি ছিল কোথায়? আমাদের যেটা স্মরণ করতে হবে যে সোভিয়েত ছিল। যদি শুধু বলশেভিক পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিত তাহলে এই বিপ্লব সফল হতো না। সোভিয়েত ছিল, কমিটি-পরিষদ ছিল, কারখানাগুলো ছিল, অল রাশিয়ান সোভিয়েত ছিল। এবং লেনিনের আওয়াজ ছিল যে ক্ষমতা আমাদের পার্টির কাছে দেওয়ার দরকার নেই। ক্ষমতা যাবে এই সোভিয়েতের কাছে এবং এই সোভিয়েত তৈরি করতে হবে।
সাংস্কৃতিকভাবে কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। পাঠাগার তৈরি করতে হবে। দেশের আনাচকানাচে পাঠাগারকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতির চর্চা হবে, বিতর্ক হবে, প্রতিযোগিতা হবে, লেখা হবে, আলোচনা হবে এবং মানুষ জেগে উঠবে। এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার যে সংগ্রাম সেই সংগ্রাম জয়যুক্ত হবে। শুধু জয়যুক্ত হবে না; রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার, তার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটানোর যে প্রয়োজন সেই প্রয়োজন সম্ভব হবে। সে জন্য সাংস্কৃতিক কাজটা এত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের মধ্যে সে সময় সংস্কৃতিচর্চায় যে উন্নতি, যে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল তারই পরিণতিতে বিপ্লব ঘটেছে। এবং সেই উন্নতি তারা করেছে নিজেদের অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে, জ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে। এবং আমরা চীনের যে অভিজ্ঞতা দেখেছি, মাও জেদং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কেন সূচনা করেছিলেন। তিনি সূচনা করেছিলেন এটি নিয়ে অনেক কথা। এটি একটি হাস্যকর ব্যাপার ছিল। কিন্তু এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছিল। কেননা তিনি দেখছিলেন যে পুঁজিবাদ ফেরত আসছে, ব্যক্তিমালিকানা চলে আসছে। তিনি দেখেছিলেন যে মুনাফা মনুষ্যত্বের ওপর আধিপত্য করছে। তখন তাঁর অনেক বয়স। সেই বয়সে বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। এ বিপ্লব যে কত প্রয়োজন ছিল, সাংস্কৃতিক বিপ্লব যে কত আবশ্যক ছিল, সেটা পরবর্তী সময় চীনের বিদ্যমান ব্যবস্থায় আমরা বুঝতে পারি যে সংস্কৃতি কত জরুরি। সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি কত জরুরি, আমরা আমাদের দেশের বিপ্লবের ক্ষেত্রেও সেটা মনে করি। এই বিপ্লব শুধু ক্ষমতা হস্তান্তর নয়। বিপ্লবগুলো হয়েছে দাসব্যবস্থা থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে সামন্ত ব্যবস্থার কাছে, সামন্তব্যবস্থার হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে পুঁজিবাদের কাছে। বিপ্লব ক্ষমতা হস্তান্তরের নয়, প্রয়োজন হবে মৌলিক বিপ্লবের। যে বিপ্লব মীমাংসা করবে সামাজিক মালিকানার প্রশ্নকে। যে বিপ্লব মুনাফাকে পরাজিত করে মনুষ্যত্বকে অধিষ্ঠিত করবে। সারা বিশ্বে এই সংগ্রাম চলছে। এ সংগ্রাম আমাদেরও এবং এই সংগ্রামের যে উত্তরাধিকার সে উত্তরাধিকার অক্টোবর বিপ্লব আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। সেই উত্তরাধিকারকে বিকশিত করা, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সেখান থেকে সাংস্কৃতিক যে কাজ সেই কাজটাকে রাজনৈতিক কাজে শুধু পরিপূরক নয়; এই কাজের প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। সে কাজ খুবই জরুরি এবং এ কাজ অত্যন্ত ব্যাপকভাবে করা দরকার। যাঁরা সমাজে বিপ্লব চান, তাঁরা জ্ঞানের চর্চা করবেন। এবং এটা অত্যন্ত সত্য কথা, মারাত্মক সত্য কথা। আমাদের দেশে জ্ঞানের চর্চা কত নেমে গেছে। এ থেকে মুক্তির যে সংগ্রাম সেটা আন্তর্জাতিক সংগ্রাম। এবং এই বিপ্লবের আরো বড় তাত্পর্য হলো অন্য বিপ্লবগুলো ছিল স্থানীয় বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লব ফরাসি দেশের বিপ্লব, কিন্তু এই যে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব; সেই বিপ্লব হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিপ্লব। এবং সারা বিশ্বে বিপ্লবের বাণী ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বময় পুঁজিবাদকে পরাস্ত করে, পুঁজিবাদকে হটিয়ে দিয়ে সমাজতন্ত্রের যে সমাজ গড়ার সেই আকাঙ্ক্ষাটা এবং দৃষ্টান্তের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটাই স্মরণীয় এবং বরণীয়ও।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আহ্বায়ক, অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদ্যাপন জাতীয় কমিটি


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি