মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন দেয়া স্বচক্ষে দেখলেন বিবিসির সাংবাদিক
Published : Wednesday, 13 September, 2017 at 8:59 PM

রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন দেয়া স্বচক্ষে দেখলেন বিবিসির সাংবাদিকস্টাফ রিপোর্টার॥
গত দুই সপ্তাহে যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, তারা এসেছে তিনটি জেলা থেকে : মংডু, বুথিডং এবং রাথেডং। এ তিনটিই হচ্ছে মিয়ানমারের শেষ তিনটি এলাকা, যেখানে বড় সংখ্যায়  ‘মুক্ত পরিবেশে’ রোহিঙ্গা বসতি আছে। এ ছাড়া বড় সংখ্যায় রোহিঙ্গারা আছে শুধু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শিবিরে। এসব জেলায় যাওয়া খুব কঠিন, রাস্তা খারাপ। তা ছাড়া সেখানে যেতে সরকারি অনুমতিপত্র লাগে। আর সাংবাদিকরা এ পারমিট খুব কমই পায়। বিবিসির জোনাথন হেড এক রিপোর্টে লিখছেন, সম্প্রতি তারা ১৮ জন দেশি-বিদেশি সাংবাদিক একটি দলের অংশ হিসেবে মংডু  জেলায় যাওয়ার এক বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন। এ সফরের একটা সমস্যা হল, আপনি শুধু সেসব জায়গাই দেখতে পারবেন যেগুলোতে কর্তৃপক্ষ তাদের যেতে দেবে। কিন্তু কখনও কখনও এমন হয় যে, এসব বিধিনিষেধের মধ্যেও আপনি অনেক কিছু বুঝে নিতে পারবেন। তা ছাড়া সরকারের কিছু যুক্তি আছে, যা শোনা দরকার। মিয়ানমার সরকার এখন একটা বিদ্রোহ পরিস্থিতি মুখোমুখি, তবে অনেকে বলতে পারেন, তারা নিজেরাই এ সমস্যা তৈরি করেছে। রাখাইন প্রদেশের এই জাতিগত সংঘাতের এক বিরাট ইতিহাস আছে এবং যেকোনো সরকারের পক্ষেই এটা মোকাবেলা করা কঠিন।
রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিটওয়েতে পৌঁছার পর সাংবাদিকদের বলে দেওয়া হল, কেউ গ্রুপ ছেড়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। সন্ধ্যা ৬টা থেকে কারফিউ, এরপর ঘুরে বেড়ানো যাবে না। সাংবাদিকরা যেখানে যেতে চান নিরাপত্তার কারণে তা প্রত্যাখ্যান করা হল। সিটওয়ে থেকে বুথিডং যেতে লাগে ৬ ঘণ্টা। সেখান থেকে এক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ ধরে গেলে পৌঁছবেন মংডু। যাওয়ার পথে পড়ল মাইও থু গি গ্রাম। সেখানে প্রথমবারের মতো পুড়িয়ে দেওয়া গ্রাম দেখতে পেলাম। এমনকি তালগাছগুলোও পুড়ে গেছে। বিবিসির জোনাথন হেড বলছেন, আমাদের প্রথম নেওয়া হল মংডুর একটি ছোট স্কুলে, এখানে আশ্রয় নিয়েছে ঘরবাড়ি হারানো হিন্দু পরিবার। সবাই বলছে, একই গল্প-তাদের ওপর মুসলিমদের আক্রমণ এবং তারপর ভয়ে পালানোর কাহিনী। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হল, যে হিন্দুরা বাংলাদেশে পালিয়েছে তারা সবাই বলছে, তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে রাখাইন বৌদ্ধরা, কারণ তারা দেখতে রোহিঙ্গাদেরই মতো। এই স্কুলে আমাদের সঙ্গে ছিল সশস্ত্র পুলিশ ও কর্মকর্তারা। তারা কি মুক্তভাবে কথা বলতে পারছিল? একজন লোক বলতে শুরু করল কীভাবে সেনাবাহিনী তাদের গ্রামের ওপর গুলি করল। কিন্তু খুব দ্রুত একজন প্রতিবেশী তার কথা সংশোধন করে দিল।
কমলা রঙের ব্লাউজ এবং ধূসর-বেগুনি লুঙ্গি পরা এক মহিলা উত্তেজিতভাবে মুসলিমদের আক্রমণের কথা বলতে লাগল। এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হল একটি বৌদ্ধ মন্দিরে। সেখানে একজন ভিক্ষু বর্ণনা করলেন, কীভাবে মুসলিমরা তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। অগ্নিসংযোগের ছবিও আমাদের দেখানো হল। ছবিগুলো অদ্ভুত। হাজীদের সাদা টুপি পরা কিছু লোক একটি ঘরের পাতার তৈরি চালায় আগুন দিচ্ছে। মহিলাদের দেখা যাচ্ছে, তারা নাটকীয় ভঙ্গিতে তলোয়ার এবং দা ঘোরাচ্ছে, তাদের মাথায় টেবিল ক্লথের মতো লেসের কাজ করা কাপড়। এরপর আমি দেখলাম, এই মহিলাদের একজন হচ্ছে স্কুলের সেই হিন্দু মহিলাটি, যে উত্তেজিতভাবে নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিল। আর এই ঘর পোড়ানো পুরুষদের মধ্যে একজনকে আমি সেই বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের মধ্যে দেখেছি। তার মানে, তারা এমনভাবে কিছু ভুয়া ছবি তুলেছে, যাতে মনে হয় মুসলিমরা ঘরবাড়িতে আগুন লাগাচ্ছে।
বিবিসির জোনাথন হেড আরও বলেন, তাদের আরও কথা হয় কর্নেল ফোনে টিন্টের সঙ্গে। তিনি হচ্ছেন স্থানীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী। তিনি বর্ণনা করলেন, কীভাবে বাঙালি সন্ত্রাসীরা (আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির জঙ্গিদের তারা এভাবেই বর্ণনা করে) রোহিঙ্গা গ্রামগুলো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে এবং গ্রামের লোকদের চাপ দিয়েছে যেন প্রতি বাড়ি থেকে যোদ্ধা হিসেবে একজন লোক দেওয়া হয়। যারা এ কথা মানছে না তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই কর্নেল আরও অভিযোগ করলেন, জঙ্গিরা মাইন পাতছে এবং তিনটি সেতু উড়িয়ে দিয়েছে। জোনাথন হেড তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে তিনি কী এটাই বলতে চাচ্ছেন, এই যে এত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে-এগুলো জঙ্গিরাই করছে? তিনি নিশ্চিত করলেন, এটাই সরকারের বক্তব্য। সেনা বাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা উড়িয়ে দিলেন। বললেন, এর প্রমাণ কোথায়? যেসব মহিলা এ দাবি করছে, আপনি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এদেরকে কি কেউ ধর্ষণ করতে চাইবে? মংডুতে যে মুসলিমদের সঙ্গে আমরা কথা বলতে পেরেছি, তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলার সাহস করতে পারেনি। আমাদের পাহারাদারদের নজর এড়িয়ে এদের দুয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। তারা বলল, নিরাপত্তা বাহিনী তাদেরকে গ্রাম ছাড়তে দিচ্ছে না। তারা খাদ্যাভাব এবং তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এক যুবক বলছিল, তারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে চায়, কিন্তু তাদের নেতারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক চুক্তি করেছে যাতে তারা চলে যেতে না পারে। এখানকার বাঙালি বাজার এখন নীরব।
একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কিসের ভয় করছেন। সরকার- তার জবাব। আমাদের প্রধান গন্তব্য ছিল মংডুর বাইরে আলেল থান কিয়াও-একটি সমুদ্র তীরবর্তী শহর। এখানে জঙ্গিরা আক্রমণ চালায় ২৫ আগস্ট ভোরে। যাওয়ার পথে আমরা দেখলাম একে পর এক গ্রাম। সব গ্রাম একেবারেই জনশূন্য। দেখলাম, নৌকা, গরু-ছাগল ফেলে লোকে চলে গেছে। কোথায় কোনো মানুষ চোখে পড়ল না। শহরটিকে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা ক্লিনিক দেখলাম, সেটাও পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে। দূরে আমরা দেখলাম চারটি জায়গা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে। থেকে থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা অনুমান করলাম, আরও কিছু গ্রামে আগুন লাগানো হচ্ছে।
লেফটেন্যান্ট আউং কিয়াং মো বর্ণনা করলেন কীভাবে তাকে আক্রমণের আগাম সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছিল। তিনি অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার জন্য ব্যারাকে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিলেন এবং ‘বন্দুক, তলোয়ার ও ঘরে তৈরি বিস্ফোরক নিয়ে আসা’ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তার লোকেরা কীভাবে লড়াই করেছে এবং তাড়িয়েছে তাও বললেন। এ লড়াইয়ে ১৭ জন জঙ্গি এবং একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা নিহত হয়। এর কিছু পরই মুসলিম জনগোষ্ঠী পালিয়ে যায়। ওই আক্রমণের দুই সপ্তাহ পরও এবং বৃষ্টির মধ্যে এই শহরের কিছু অংশে এখনও আগুন জ্বলছে কেন-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়ছিলেন। তিনি ইতস্তত করে বললেন, হয়তো কিছু মুসলিম এখনও রয়ে গেছে এবং চলে যাওয়ার আগে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে গেছে। তবে আলেল থান কিয়াও শহর থেকে ফেরার পথে এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার জন্য কেউ তৈরি ছিল না। আমরা দেখলাম, রাস্তার পাশেই ধানক্ষেতের ওপারে গাছের ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে উঠছে। বোঝাই যায়, আগুনটা লেগেছে এই মাত্র। আমরা চিত্কার করে গাড়ি থামাতে বললাম। গাড়ি থামল। আমরা আমাদের সরকারি সঙ্গীকে ফেলেই  দৌড়াতে শুরু করলাম। পুলিশ আমাদের সঙ্গে এলো। কিন্তু তারা বলল গ্রামের ভেতরে যাওয়াটা নিরাপদ হবে না। আমরা তাদের ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। আগুনে বাড়িঘর পোড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি চারদিকে। মাটিতে ছড়িয়ে আছে কাপড়-বোঝাই যায় মুসলিম মহিলাদের কাপড়। দেখলাম কয়েকজন পেশীবহুল দেহের যুবক, তাদের হাতে তলোয়ার এবং দা, রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
১৮ জন সাংবাদিককে তাদের দিকে দৌড়ে আসতে দেখে তারা একটু বিভ্রান্ত হল। তারা চেষ্টা করল যাতে আমরা তাদের ভিডিও করতে না পারি। দুজন দৌড়ে গ্রামের আরও ভেতরের দিকে চলে গেল। তারা বলল, তারা রাখাইন বৌদ্ধ। আমাদের একজন সহযোগী তাদের একজনের সঙ্গে অল্প একটু সময় কথা বলল। তারা স্বীকার করল, পুলিশের সাহায্য নিয়েই তারা বাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়েছে। আমরা এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, একটা মাদ্রাসা। যার ছাদে এই মাত্র আগুন লাগানো হয়েছে। আরবিতে লেখা বইপত্র বাইরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। একটা প্লাস্টিকে জগ। তার থেকে পেট্রলের গন্ধ বেরুচ্ছে, পড়ে আছে রাস্তার ওপর। গ্রামটির নাম হচ্ছে গাওদু থার ইয়া। গ্রামের বাসিন্দাদের কোথাও দেখলাম না। যে রাখাইন লোকেরা আগুন লাগিয়ে ছিল, তাদের দেখলাম ঘরগুলো থেকে লুট করা নানা জিনিস নিয়ে আমাদের সঙ্গে থাকা পুলিশের গাড়ির সামনে দিয়েই চলে গেল। এখানকার কাছেই বড় পুলিশ ব্যারাক আছে। তবে আগুন লাগানো ঠেকাতে কেউ কোনো চেষ্টা করেনি।

 





 


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি