সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭
শোকের মাসে আবার সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 12 August, 2017 at 7:52 PM

শোকের মাসে আবার সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাআগস্ট মাসকে আমরা বলি জাতীয় শোকের মাস। কিন্তু এ মাস যে কখনও কখনও জাতির জন্য সংকটের মাসেও পরিণত হতে পারে, এ বছরের জুলাই-আগস্ট মাসের ঘটনাবলিই তার প্রমাণ। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ (রায়ের অন্তর্ভুক্ত নয়) নিয়ে রাজনৈতিক সুস্থ বিতর্ক হলে কথা ছিল না; কিন্তু একটি রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির যে চেষ্টা চলছে, এটা অত্যন্ত অশুভ লক্ষণ।
অবশ্য এই চেষ্টাটা নতুন নয়। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে জাতির পিতা ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং পরবর্তীকালে জাতীয় নেতাদের হত্যার দ্বারা যে জাতীয় সংকট সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা থেকে আমরা এখনও মুক্ত হইনি।

দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর এই সংকট অনেকটা প্রশমিত হয়েছে বটে; কিন্তু সম্পূর্ণ দূর হয়নি। সময়-সুযোগ পেলেই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বিরোধী পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত মহলগুলো জোট বেঁধেছে এবং দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। একবার এই অশুভ জোট সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তার কাঁধে ভর করেছিল। বর্তমানে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কাঁধে ভর করার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধান বিচারপতি এই চেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। আমি মাঝে মধ্যে ভাবি, আওয়ামী লীগের অতীত ও বর্তমানের সরকারগুলোর অনেক ভুলত্রুটি আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ধৈর্য, সহিষুষ্ণতা ও উদারতা প্রশ্নাতীত। তার এই গণতন্ত্রপ্রীতি ও উদারতা বারবার কেন ভেতর থেকেই আঘাত পায়, তা আমি বুঝি না। প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসে তিনি বিএনপির মতো দলীয় ও রাজাকার শ্রেণির কোনো ব্যক্তিকে এনে রাষ্ট্রপতি পদে বসাননি। সব দলমতের ঊধর্্েবর একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে সব মহলের শ্রদ্ধাভাজন সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন।এমন একজন ব্যক্তিকেও বিএনপি প্রথমে দলীয় ব্যক্তি আখ্যা দিয়ে নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদে তার উদ্বোধনী ভাষণের দিনটিতেই সংসদ বর্জন করেছিল। তাতে সাহাবুদ্দীন সাহেবের মনে আঘাত লাগেনি। বরং তার মনে যে বিএনপির প্রতি সুপ্ত প্রেম ছিল, তা তার প্রথম ভাষণের মধ্যেই প্রকাশ হয়ে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, 'আমি আজ যে ভাষণটি দিচ্ছি, সেটা আমার লেখা নয়, এটা আমাকে লিখে দেওয়া হয়েছে এবং আমি তা পাঠ করছি।' তখনই আমার মনে হয়েছিল, সাহাবুদ্দীন সাহেব মোটেও নিরপেক্ষ নন।ব্রিটেনের রাজা বা রানীও পার্লামেন্ট উদ্বাধনকালে নিজের ভাষণ নিজে লেখেন না। তাকে ক্ষমতাসীন দল ভাষণটি লিখে দেয়। যখন যে দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে, রানী তাদের লেখা ভাষণই পার্লামেন্টে দেন। ক্যাপিটালিস্ট টোরি দল এবং সোস্যালিস্ট লেবার পার্টি কোনো দলের প্রতিই তার পক্ষপাতিত্ব দেখান না। তাদের সরকারের দ্বারা লিখিত ভাষণ দেন এবং কখনও বলেন না, 'এটা আমার ভাষণ নয়, এটা আমাকে লিখে দেওয়া হয়েছে, আমি তা পড়ছি মাত্র।' সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের এই ভূমিকার কথা জানা থাকা সত্ত্বেও সাহাবুদ্দীন সাহেব সংসদে দাঁড়িয়ে অন্য কথা বলতে গেলেন কেন? রহস্যটা কী ছিল?

বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকেও অনেক বাধা ও আপত্তির মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই পছন্দ করেছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, তার এই মনোনয়ন ছিল সঠিক। বিচারপতি সিনহা একজন যোগ্য, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক। সাহসী বিচারকও। নানা প্রতিকূলতা ও অপপ্রচারের মুখেও তিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের যথাযথ বিচার ও দণ্ডদানে পিছপা হননি। বিচারকদের (দোষী সাব্যস্ত হলে) অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় তার নেতৃত্বে আপিল আদালত বহাল রাখলেও আপত্তি করার কিছু ছিল না। কিন্তু এই রায়ের সঙ্গে দেশ, সরকার, এমনকি জাতির পিতা সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির কিছু পর্যবেক্ষণ অনেকের কাছেই অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকও এ সম্পর্কে একটি সুন্দর বক্তব্য রেখেছেন। তার এই বক্তব্য সময়োচিত। আমি প্রধান বিচারপতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা রেখেই দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বলছি, তিনি তার পর্যবেক্ষণকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন; কিন্তু দেশের একটি অশুভ জোট ইতিমধ্যেই তার পর্যবেক্ষণকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে রাজনৈতিক সংকট ডেকে আনার চেষ্টা করছে। তারা বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি করছে। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করার জন্য প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণকে ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।আমার বিনীত নিবেদন, প্রধান বিচারপতি তার এই পর্যবেক্ষণগুলো রায় থেকে এক্সপাঞ্চ (বর্জন) করার জন্য নিজেই উদ্যোগ নিন। দেশকে অশুভ শক্তির চক্রান্ত থেকে বাঁচান। রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে মুক্ত করুন। বর্তমান সরকারও তাই চায়। বর্তমান সমস্যার অনেকটাই আইনমন্ত্রীর নির্বুদ্ধিতা ও আমলাদের দ্বারা চালিত হওয়া থেকে উদ্ভূত।

তথাপি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে, আদালতের রায় নিয়ে তারা কথা বলছেন না। কিন্তু রায়ের বাইরে যে পর্যবেক্ষণগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়া যায় কি-না সে চেষ্টা তারা করবেন। সরকারের এ প্রচেষ্টায় দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রধান বিচারপতির সহযোগিতা দেওয়া উচিত। ষোড়শ সংশোধনী সম্পর্কে আদালত যে রায় দিয়েছেন, তার ভালোমন্দ দিক সম্পর্কে আমি এখন কোনো আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি ড. কামাল হোসেন নই যে, নিজে সংবিধান রচনাকালে এক কথা লিখব এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে আরেক কথা বলব। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির ধারণা, ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ের সঙ্গে দেশের বর্তমান অবস্থা, পার্লামেন্ট, এমনকি জাতির পিতাকে ইঙ্গিত করে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, তা শুধু দেশের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়, তা দেশে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির সহায়ক হতে পারে। বিশ্বের যে কোনো উন্নত দেশেও জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে কয়েকটি বিষয়কে সর্বপ্রকার বিতর্কের ঊধর্্েব রাখা হয়। এই বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা এবং রাষ্ট্রের মূলনীতি। বিএনপি জাতির পিতা ও জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছে। জামায়াত ও তার সগোত্রীয় দলগুলো জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা বদলাতে চেয়েছে। রাষ্ট্রের মূলনীতি ভাঙতে চেয়েছে। 'কোনো এক ব্যক্তির দ্বারা দেশ স্বাধীন হয়নি'- মহামান্য প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যটি শুধু আপত্তিকর নয়, অশুভ জোটের প্রচারণায় সাহায্য জোগানোর নামান্তর বলেও বিবেচিত হতে পারে। প্রধান বিচারপতির কাছে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা, ষোড়শ সংশোধনীর সঙ্গে দেশ কে স্বাধীন করেছে, তা নিয়ে কথা বলার সম্পর্কটা কোথায়? এবং কী উদ্দেশ্যে আবার মীমাংসিত বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কাজে জল ঢালা হলো?

 প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে দেশের অবস্থা সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়েছে, দেশের অবস্থা কি সত্যই ততটা খারাপ? তেরেসা মের মাইনরিটি সরকারের আমলে ব্রিটেনের এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির আমলে আমেরিকায় যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাকে অনেকেই বলছেন অস্থির, অনিশ্চিত অবস্থা। আমেরিকায় তো প্রেসিডেন্টের কয়েকটি নির্বাহী অর্ডার নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে লড়াই পর্যন্ত হয়েছে। তা তো বিচারপতিরা আমেরিকায় অরাজকতা দেখা দিয়েছে বলে এমন কোনো পর্যবেক্ষণ দেননি, যাতে দেশটিতে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ তো বর্তমানে ব্রিটেন ও আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল। এমনকি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মোকাবেলার ক্ষেত্রেও।
এখানেই প্রশ্ন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির রায়বহির্ভূত পর্যবেক্ষণে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে এই অতিরঞ্জন, অতিকথন দেখা গেল কেন? অনেকে বলছেন, সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে যে বিবাদ দেখা দিয়েছিল এবং '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার ও কুৎসা চালানো হয়েছিল, তাতে প্রধান বিচারপতি বিরক্ত ও উত্ত্যক্তবোধ করেছেন এবং তার প্রতিক্রিয়া এই পর্যবেক্ষণে প্রতিভাত হয়েছে। আমি জানি না, এ ধারণার মধ্যে সত্য-মিথ্যা কতটুকু আছে? আমি আগেও লিখেছি, একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিরোধ ভালো নয়। তাতে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও রক্ষা পায় না।


 পাকিস্তানে দুর্নীতির দায়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পদচ্যুত হলেও অনেকে এটাকে বলছেন জুডিসিয়াল ক্যু। পাকিস্তানে মিলিটারি ক্যুর স্থান এখন দখল করল জুডিসিয়াল ক্যু। বাংলাদেশেও সামরিক শাসনের সহযোগী ছিলেন বহুকাল বিচার বিভাগের একাংশ।বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতি শুধু একজন প্রাজ্ঞ বিচারক নন, তিনি দেশের বিচার বিভাগের অতীত-বর্তমান জানেন, বিচার বিভাগ এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা দরকার। তার ভুলত্রুটি যতই থাকুক। নইলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা পাওয়া দূরে থাক, তাকে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার আজ্ঞাবহ করা হবে। বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে ধৃষ্টতা। তিনি তার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন আছেন এবং বর্তমান বছরের আগস্ট মাসটিকে আবার রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির মাস হতে দেবেন না বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি