সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭
সংবিধানে আপনাআপনি কোনো অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হয় না
ড. মিজানুর রহমান
Published : Friday, 11 August, 2017 at 7:10 PM


সংবিধানে আপনাআপনি কোনো অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হয় নাসাম্প্রতিক প্রসঙ্গ
বাংলাদেশ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানসম্মত কি-না, আপিল বিভাগের সামনে এটাই ছিল বিচার্য বিষয়। এ রায় ৩ জুলাই প্রদান করা হয়েছে এবং তাতে বলা হয়েছে, এ সংশোধনী সংবিধানসম্মত নয় এবং সঙ্গত কারণেই তা বাতিল বলে গণ্য হবে। ৩১ জুলাই আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণ বিবরণ (প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠা) প্রকাশ হয়েছে এবং পরের কয়েকটি দিন সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে, ব্যক্ত হচ্ছে মতামত। আপিল বিভাগে হাইকোর্ট এটি পাঠিয়েছিলেন এবং উত্তর চাওয়া হয়েছিল সুনির্দিষ্ট বিষয়ে। কিন্তু একজন আইনের ছাত্র হিসেবে আমার মনে হয়েছে, আপিল বিভাগ অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। এর মধ্যে কিছু বিষয় স্পর্শকাতর, এমনকি রাষ্ট্রের মৌলিক সত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জাতীয় ইতিহাসের অমীমাংসিত বিষয়াদিও নতুন আঙ্গিকে, নতুন কৌশলে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে, যা যে কোনো আইনের ছাত্রের কাছেই উদ্বেগের বিষয়। বিচার্য বিষয় ছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সাংবিধানিক কি-না। সংবিধানের আলোকেই এর বিচার করতে হবে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'জনগণের পরম অভিপ্রায়রূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।' আমাদের ফরেন এলিমেন্ট আমদানি করে কোনো কিছু নিরীক্ষার সুযোগ নেই।

আপিল বিভাগের সামনে বিচার্য বিষয় ছিল বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা। ১৯৭২ সালে সংবিধান পরিষদ জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধান প্রণয়ন করেছে। এই সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের ফসল। বিচারকদের অসদাচরণের ক্ষেত্রে অপসারণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল জাতীয় সংসদকে। পরে সামরিক শাসনামলে সুুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের হাতে এ ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়। এটাকেই আমি বলছি ফরেন এলিমেন্ট, বৈদেশিক উপাদান। ষোড়শ সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধানসম্মত কি-না, সেটা এই ফরেন এলিমেন্টের আলোকে বিচার করা যায় না।

মনে রাখতে হবে, আমাদের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের সৃষ্টি। আইন পরিষদের সৃষ্টি। আইন বলি, সর্বোচ্চ আইন বলি, সবকিছুর জন্মদাতা আইন পরিষদ। আর এই আইন পরিষদের জন্মদাতা বাংলাদেশের জনগণ। এই জনগণের কাছে প্রত্যেকের জবাবদিহি নিশ্চিত থাকা চাই। নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহি করে। সংসদও জবাবদিহি করে। সংসদে যারা নির্বাচিত হন, তাদের পাঁচ বছর পরপর জনগণের কাছে প্রার্থী হয়ে যেতে হয়। ম্যান্ডেট নিতে হয়। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, অধস্তন আদালতের রায় নিয়ে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। নিম্ন আদালত যে রায় দেন সেটা যায় উচ্চ আদালতের কাছে। প্রশ্ন সহজভাবেই উঠতে পারেথ উচ্চ আদালতের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। এর একটি উপায়, রায়ের পর্যালোচনা। কিন্তু যদি গুরুতর অভিযোগ ওঠে? যদি অসদাচরণের ঘটনা ঘটে? এ কাজটি নিজেরা করবে, নাকি জনগণ করবে? এই জনগণের ওপর যদি ভরসা রাখি, তাহলে এ ভার বর্তাবে জাতীয় সংসদের ওপর। কারণ জনগণই সংসদের স্রষ্টা। সংসদ এ ক্ষেত্রে সরাসরি আলোচনা করে না। তদন্তের জন্য যোগ্য, দক্ষ কোনো সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়। তারা প্রতিবেদন দিলে সেটা নিয়ে আলোচনা হয় সংসদে। প্রজাতন্ত্রের মালিকের কাছেই এভাবে বিষয়টি যায়। কিন্তু সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল বিদেশি এলিমেন্টের ফল। তার হাতে দায়িত্ব দিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় কীভাবে?

দেশের প্রধান নির্বাহী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি যদি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন, তাহলে বিচারকদের ক্ষেত্রে এটা করায় আপত্তি বা দ্বিধা কেন? আইনের ছাত্র হিসেবে এ বিষয়টিকে যৌক্তিক মনে করার কারণ দেখি না। বরং যেভাবে বিষয়টির উপসংহার টানা হয়েছে তার আলোকে বলতে পারি, সার্বিক বিষয়াদি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন ছিল।

আমি মনে করি, একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন মীমাংসা করতে গিয়ে অন্য যে প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে, যেভাবে রাজনৈতিক মন্তব্য করা হয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে সেটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। এখানে 'আমিত্ব' এসেছে, 'আমরাত্ব' এসেছে। বলা হয়েছে, একজনে সব হয় না। সকলে মিলে সমাজ। কালেকটিভ উইসডম থাকে। কিন্তু যখন বলি বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র একক ব্যক্তির চেষ্টার ফল নয়, তখন ভাবনা আসেথ কেন এভাবে বলা হয়। সর্বোচ্চ আদালত হয়তো একটি বিষয় এড়িয়ে গেছেন। ইতিহাস সর্বদা জনগণের সংঘবদ্ধ কাজের ফল। তবে ব্যক্তির ভূমিকা উপেক্ষা করার মতো নয়। এক ব্যক্তির ভূমিকা একটি ভূখণ্ড কিংবা জনগোষ্ঠীকে হাজার বছর এগিয়ে নিতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তির ভুলে কিংবা অসতর্কতায় এক হাজার বছর পিছিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ যে স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, এই স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম যে যৌক্তিক এবং তা যথাযথ পরিণতি লাভ করতে পারে, সেটা আপামর জনগণ উপলব্ধি করতে পেরেছে। আর তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি সঞ্চারিত ও বিকশিত করেছেন এক ব্যক্তি। তাকে অবজ্ঞা করা, ছোট করা, তাচ্ছিল্য করার প্রয়াস গ্রহণযোগ্য নয়, হতে পারে না। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি সমাজে ছিলেন। এখনও আছেন। কিন্তু জনগণের মনে কী আকাঙ্ক্ষা, কী তাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা সেটা তারা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী ব্যক্তি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এ কারণেই এটা ভেবে কষ্ট পাই যে, জাতির পিতার যে অনন্য অবদান সেটাকে খাটো করার প্রয়াস কি এ রায় ও পর্যবেক্ষণে লুকিয়ে আছে? আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, এভাবে উচ্চ আদালত বলেনি কিংবা বলতে চায়নি। অথবা তেমন চেষ্টাও নেই। আমাদের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে মনে হয়েছে, অবচেতন মনেই হয়তো পাকিস্তানে সুপ্রিম কোর্টের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়েছে। এটা যদি সঠিক হয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যতটা না নিশ্চিত হবে তার চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা ষোড়শ সংশোধনীকে কেন্দ্র করে প্রদত্ত এ রায়ে নির্বাহী বিভাগকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা লক্ষ্য করি। নির্বাহী বিভাগকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার কি কোনো প্রয়োজন ছিল? এটা গণতন্ত্রের জন্য, সাংবিধানিকতার জন্য সুখকর বলে মনে হয় না।

এটি আরও দৃশ্যমান হয়েছে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের প্রথম সভা অনুষ্ঠানের খবরে। যে বিষয়টি আদৌ সংবিধানে নেই, যা বাতিল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, সেই বাতিলকৃত অংশ কীভাবে আপনাআপনি সংবিধানের অংশ হবে? সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ আগেই বলেছি। সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী এ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হলে সর্বোচ্চ আদালত তা বাতিল করতে পারেন। কিন্তু যেটা বাতিল করা হয়েছে, তার পরিবর্তে অন্য কিছু অর্থাৎ যে অনুচ্ছেদ বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, সেটা আপনাআপনি পুনর্স্ট্থাপিত হয় না। ষোড়শ সংশোধনী গ্রহণ করার আগে ছিল সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল। কিন্তু সংসদের হাতে বিচারকদের অসদাচরণের ঘটনায় অভিশংসনের যে ক্ষমতা প্রদত্ত হয়েছিল, সেটা বাতিল করা হলে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল আপনাআপনি পুনর্স্থাপিত হয় না। এ জন্য জন্মদাতা চাই, আঁতুড়ঘর চাই। আর সেটা হচ্ছে জাতীয় সংসদ বা আইন সভা। সেখানে অবশ্যই যেতে হবে। বাতিল হওয়া অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবন্ত করার সুযোগ নেই। যে বিষয়টি সংবিধানে নেই, সে ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রথম সভা কীভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিক। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল যে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে, সেটা নির্ধারণ করবে জাতীয় সংসদ। তাহলে এত দ্রুত কেন এ কাউন্সিলের সভা ডাকা হলো? এ সভার আইনগত বৈধতা কতটা, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একজন বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়ে বলেছেন, সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদের আলোকে নয়, বরং চতুর্থ সংশোধনীর আলোকে বিচার করা হচ্ছে। আইনের ছাত্র হিসেবে মনে করি, এটা অগ্রহণযোগ্য। চতুর্থ সংশোধনী সঠিক কি-না, সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। এটা চ্যালেঞ্জ হয়নি। তাই অবিকল রয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৭২ সালে গণপরিষদে যে সংবিধান গৃহীত হয়েছে তার নিরিখে বিচার না করে কেন চতুর্থ সংশোধনীর আলোকে বিচার করতে চাওয়া? এমন নজির কোথায় মিলবে? আমার মনে হয়েছে, সিদ্ধান্ত কি পূর্বনির্ধারিত?

আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা বরাবরই রয়েছে। আবার সামরিক শাসনামলে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন কম নেই। বিচার বিভাগ সংবিধানের প্রতি কতটা অনুগত, তার উত্তর চাওয়া যেতেই পারে। সামরিক শাসন সাংবিধানিক আইনের ওপরে নয়, এমন অভিমত প্রদানের জন্য একজন বিচারপতিকে চাকরি হারাতে হয়েছে। তাকে অবসর নয়, অপসারণ করা হয়েছে কোনো ধরনের সুবিধা প্রদান ছাড়াই। এটা অপরাধ। তার প্রতি চরম অন্যায় করা হয়েছে। বিবেকের তাড়না থাকলে কেন এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয় না? এই ঐতিহাসিক ভুল শোধরানোর সৎ সাহস কেন দেখি না? কেবল সামরিক শাসনের সময়কালকে ব্যানানা রিপাবলিক বানানোর চেষ্টা বলাই কি যথেষ্ট?

পরিশেষে আবার বলি, ষোড়শ সংশোধনী বৈধ কি অবৈধ এই সহজ-সরল বিষয়টি নিয়ে রায় প্রদান করতে গিয়ে এমন সব প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে, যা আমাদের বিভক্ত সমাজকে আরও বিভক্ত করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এটা কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি