বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৬)
Published : Monday, 17 July, 2017 at 8:46 PM

হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৬)ঈদের দিনে কারাগারের ভাষণ ও রাজাকারদের কান্না জর্জ কোর্টে বিতর্ক
আমাদের গ্রেফতারের মাত্র তিন মাসের মাথায় ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা খাজা সাহেবের দোকান আক্রমণ করে। এদিকে সিরাজুল আলম খান, রব, জলিলরা জাসদ গঠন করে বৈঞ্জানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শকে সামনে রেখে সারাদেশে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। গণবাহিনী নামে একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠনেরও পরিকল্পনা করে। ওদের চটকদার কথাবার্তা যুব সমাজকে ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করে। সারাদেশে ওরা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। রব জলিলদের সাথে স্বাধীনতা বিরোধীরাও  মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। ‘৭২-এর ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে দেব। এরূপ একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের একটি মহল আমাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তারা আমাদের মুক্তির ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়। ফেনী অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারাও আমাদের সপক্ষে তৎপরতা শুরু করে। তবে বি এল এফ-এর ছেলেরা প্রায় সবাই জাসদে যোগ দেয়। আমাদের মুক্তির ব্যাপারে মুছা সাহেব ও বেলায়েত বিশেষ ভূমিকানেয়। লুতু ছিল সমন্বয়কারীর ভূমিকায়। অবশেষে মণি ভাইয়ের কারণে আমাদের মুক্তির পথ খোলসা হয়। আটকের সপ্তাহ খানেক পরে নোয়াখালী জেল থেকে করিম ও তার সঙ্গীদের চট্টগ্রাম জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমাকে  পাঠানো হলো কুমিল্লা কারাগারে। আমার সঙ্গীরাসহ পুরো সময়টা আমি কুমিল্লার ২০ সেলে কাটাই। এই সময় এক ঈদের দিন সকল শ্রেণীর আসামিকে এক জায়গায় আনা হলো ঈদের নামাজ পড়ার জন্য। ইমাম এসেছিল বাইরে থেকে। এখানে ইমাম সাহেব কিছু বয়ান করেন। পরে আমাকেও কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হলো। প্রায় আধঘন্টা ধরে আলোচনা করি । যে মুহূর্তে বলি আপনাদের সন্তানেরা যখন তাদের মায়ের কাছে জানতে  চাইবে, আব্বু কোথায়? অন্যদের মতো আমরাও আব্বুর সাথে নামাজে যাব। তখন স্ত্রীরা কি সান্ত্বনা দেবে জানি না। তবে এই আনন্দের দিনেও চোখের জলে তারা একাকার হবে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাজার আসামি কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ গড়াগড়ি দিতে থাকে। অনেক চেষ্টা করেও যখন কান্নার রোল থামানো যাচ্ছে না, তখন খুব অল্প কথায় আমি আলোচনা শেষ করি। ইমাম সাহেব কান্না থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কান্না থামানোর জন্য আবারও আমাকে দাঁড়াতে হলো। মোনাজাত শেষে কোলাকুলির পালা। চতুর্দিক থেকে এক সাথে হাজার হাজার আসামি আমার দিকে ছুটে এলো কোলাকুলি করার জন্য। এতে চরম বিশৃঙ্গলা শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পাগলা ঘন্টা বাজিয়ে বাইরে থেকে আরও সিপাহী ভিতরে আনা হলো। প্রায় আধঘন্টা চেষ্টার পর জেল পুলিশরা ভিড় ঠেলে আমাকে সেলে নিয়ে এলো।
এরপর লাইন ধরিয়ে একে একে সবাইকে আমার সঙ্গে মোলাকাত করার সুযোগ দেওয়া হলো। এতে প্রায় তিন ঘন্টা সময় অতিবাহিত হয়। আসামিদের শতকরা আশি ভাগই স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক ছিল। এ সময় মিদন মিঞা ও মজলিসপুরের তোফাজ্জলও ওই জেলখানায় ছিল। কুমিল্লা কারাগারে দিনগুলো ভালোই কাটছিল। মনেই হতো না জেলে আছি। প্রথম দিকে ফরিদপুরের জামান সাহেব ছিলেন কুমিল্লা জেলের ডি আই জি। এখানে রাজশাহীর ফজলে ইলাহী দীর্ঘদিন জেলারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমদিকে ডেপুটি জেলার কিছু ঝামেলা করার চেষ্টা করলেও পরে ভয়ে ভয়ে থাকত। জেলখানায় এতটাই প্রভাব বেড়ে গেল যে, জেল কর্তৃপক্ষ সকল ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে নিত। প্রতিদিন সকাল দশাটায় সেল থেকে গেটে যেতাম। বাইরে থেকে লোকজনের সাথে দেখা করাও কথা বলার জন্য। খাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আবার জেল গেটে গিয়ে বসতাম। ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেল। বুঝলাম আমাদের মুক্তি আসন্ন। এ সময় একদিন আমাদেরকে নোয়াখালী পাঠিয়ে দেওয়া হলো। খবর পেলাম ওখান থেকে মুক্ত করা হবে। একদিন পরেই নোয়াখালী জজ কোর্টে আনা হলো। পরিচিত দু- একজন উকিল সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কি হবে? কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারল না। পরে একজনকে আমাদের জামিনের আবেদন করতে বলি, তিনি বলেন সেটি সম্ভব নয়। কি যেন একটা ফাইল জজ সাহেবের সামনে আনা হলো। তিনি তাতে দস্তখত করে চলে যাচ্ছিলেন। আমি কাঠগড়া থেকেই জজ সাহেবকে থামতে বলি। তিনি এসে আবার আসন গ্রহণ করেন। আমি তাকে প্রশ্ন করি আপনার জামিন দেওয়ার বা শাস্তি দেওয়ার কোনো এক্তিয়ার নেই। তাহলে কেন আমাদেরকে এখানে আনা হলো। ৭ মিনিট ধরে জজ সাহেব আমার কথা শোনে। তারপর তিনি বলেন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা  কমে গেছে বলেইতো রাজপুত্রের মতো ছেলেগুলোর হাতে হাতকড়ি। সেলিম পিন্টু, হামদান, মহিউদ্দিন, বিপ্লবসহ অনেকেই দেখতে সুপুরুষ ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়। আজকে যিনি জাতির পিতা তার হাতেও হাতকড়া লেগে ছিল। জজ সাহেব ক্ষুদ্ধ হয়ে চলে গেলেন। উকিল সাহেবরা চিন্তিত হলেন। কেউ কেউ বললেন আপনাদের মুক্তির প্রক্রিয়াটি মনে হয় বিলম্বিত হবে। বিলম্বিত কিছু হয়নি, পরদিনই সেলিম ও আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এদিন আদালতে বিরিঞ্চির তাহের ও বিজুর স্বামী উকিল হিসেবে উপস্থিত ছিল।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। সৈয়দ রেফাত সিদ্দিকী (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মোঃ যোবায়ের (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৯২২৭৮৭২৭৮।
বার্তা বিভাগ: ৮১১৯২৮০, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০২-৮১৫৭৯৩৯ ই-মেইল : news.hazarika@gmail.com, বিন : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি