মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭
বন্যাঝুঁকিতে ৪৮ দেশের মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশ
Published : Sunday, 16 July, 2017 at 10:16 PM

বন্যাঝুঁকিতে ৪৮ দেশের মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশস্টাফ রিপোর্টার॥ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে—জার্মান ওয়াচ, জাতিসংঘের আইপিসিসি, ব্রিটেনের পরামর্শক সংস্থা ম্যাপলক্রফটসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে আগেই। এবার জলবায়ু পরির্তনের কারণে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস ও বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহ চিত্র দেখা গেল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নতুন এক প্রতিবেদনে। শনিবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার দিক থেকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৪৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। প্রতিটি বন্যায় শূন্য থেকে শতভাগ ফসলহানি হচ্ছে এখানে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। বাংলাদেশে একেকটি ঘূর্ণিঝড়ে কত ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার একটি হিসাব দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি বলেছে, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৫০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে ১০ বছরের মতো। এডিবি বলছে, আগে বাংলাদেশে ১০০ বছর পর পর একটি বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা ঘটত। এখন এ সময় কমে গেছে। দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এখন বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে। আর ঘন ঘন দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ও সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। এডিবির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে বাস্তুচ্যুতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ওই অঞ্চল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ঠাঁই নিচ্ছে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগর চট্টগ্রামে। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের একটি অংশ ভারতে পাড়ি দিচ্ছে বলেও এডিবির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পটসডেম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ-পিআইকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে এডিবি।
প্রতিবেদনটি এমন সময় প্রকাশিত হলো, যখন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা চলছে। জামালপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, বগুড়াসহ পুরো উত্তরাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। উজান থেকে নেমে আসা পানি আর বৃষ্টিতে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এডিবি বলেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর বন্যার স্থায়িত্ব ১৫ দিন করে বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এডিবি মনে করে, ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ ২১) বিশ্বনেতারা চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অর্জন হবে না। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে করে ২০৮০ সাল নগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৫ সেন্টিমিটার বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এমনিতেই দুর্যোগপ্রবণ দেশ। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে ঝুঁকিতে, সেটি বিশ্বজুড়ে এখন প্রায় স্বীকৃত। তাঁরা বলছেন, গত চার মাসের ব্যবধানে চারটি দুর্যোগ ঘটে গেছে দেশে। এপ্রিলে হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ফসলহানি, মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোরায় আটজনের প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, জুনে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১৫৪ জনের প্রাণহানির পর জুলাইয়ে চলছে বন্যা। গত মাসে সরেজমিন সুনামগঞ্জের কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, হাওরাঞ্চলের আগাম বন্যার কারণে ফসলহানি হওয়ায় জীবিকার সন্ধানে অনেকে নিজ জেলা ছেড়েছে। ঋণ পরিশোধ করার ভয়েও অনেকে ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্য জেলায় চলে গেছে।
জানতে চাইলে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, এডিবি, বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করে, তা জাতীয় নীতিতে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলে না। মানুষ শুধু জানে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুতি ঘটছে এবং একটি অংশ ভারতেও যাচ্ছে—এটা অত্যন্ত উদ্বেগের।
এডিবি বলেছে, বেশ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর হার বাড়ছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এটা বাস্তুচ্যুতির অন্যতম কারণ। বাস্তুচ্যুতির জন্য শুষ্কতা, নদীভাঙন, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। লবণাক্ততার বিষয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত কালের কণ্ঠকে বলেন, লবণাক্ত পানি আগে উঠে আসত সুন্দরবনসহ সাতক্ষীরার নদ-নদী পর্যন্ত। এখন তা গোপালগঞ্জের মধুমতী নদীতে এসে ঠেকেছে। ফলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে এখন সুপেয় পানির সংকট। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে খরা বাড়বে। এতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও বাড়বে বলে জানিয়েছে এডিবি।
শনিবার ‘এ রিজিওন অ্যাট রিস্ক দ্য হিউম্যান ডাইমেনশন অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এডিবি আরো বলেছে, ২০৮০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬২ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১৩ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বর্তমানের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি এলাকাজুড়ে বন্যা হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৫ সেন্টিমিটার বাড়লে ৩ শতাংশ ভূমি সাগরে চলে যাবে। এ ছাড়া ৬ শতাংশ বন্যাপ্রবণ এলাকা বাড়বে। এতে বাস্তুচ্যুতি আরো বেশি করে ঘটবে। এডিবি জানিয়েছে, বন্যার কারণে বাংলাদেশে ১০ কোটির বেশি মানুষ ঝুঁকিতে পড়ছে। এ ছাড়া এখন প্রতিবছর যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, তাতে ২০৬০ সাল নাগাদ উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১১ কোটিতে। এডিবি প্রতিবেদনে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে। এখানে বেশির ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আর আবাদি জমির পরিমাণ বাংলাদেশে অনেক কম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততাও বাড়ছে। ফলে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতাও ঝুঁকিতে আছে।
এডিবি মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ ছাড়া রোদের তীব্রতা বাড়বে। এতে মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়বে বলেও মনে করে এডিবি। চলমান বন্যার কারণে খাদ্য সংকটে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ। দেখা দিয়েছে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার এমন বিরূপ প্রভাব বলে জানান আইনুন নিশাত।
সম্প্রতি প্রকাশিত জার্মান ওয়াচের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। আগের বছরও একই অবস্থান ছিল। বিশ্বব্যাংকের আলাদা একটি প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন এলাকায় ২৭ প্রজাতির মাছ মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। এর আগে ২০১৪ সালে এডিবির আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ এবং ২১০০ সাল নাগাদ প্রায় ৯.৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দেশে আবহাওয়ার বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ বছর চৈত্র মাসে দেখা মেলেনি চিরায়ত সেই কাঠ ফাটা রোদের। মাঠ-ঘাট, খাল-বিল-প্রান্তর ফেটে চৌচির হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। শীতের স্থায়িত্বও এবার ছিল খুব কম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাত্র চার দিনে কানাডায় হারিয়ে যায় একটি প্রাচীন নদী। গ্রিনল্যান্ডের পিটারম্যান হিমবাহের কেন্দ্রে বড় ফাটল ধরা পড়েছে নাসার ছবিতে। অ্যান্টার্কটিকায় লারসেন হিমবাহের বিশাল একটি অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পৃথিবীর এক প্রান্ত যখন বন্যায় ভাসছে, আরেক অংশ পুড়ছে খরায়। আফ্রিকা মহাদেশের বিরাট অংশজুড়ে তো দুর্ভিক্ষাবস্থা চলছে। বিশ্বের অনেক এলাকা যখন তুষারে চাপা পড়ছে, তখন দাবানলে পুড়ছে বনভূমি অধ্যুষিত অনেক দেশ।





সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি