সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের সম্পর্কের অবনতি
Published : Sunday, 16 July, 2017 at 8:47 PM

এ এম এম শওকত আলী
 রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের সম্পর্কের অবনতি
বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি দুই বছর ধরেই বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান ছিল। দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের কিছু উন্নত দেশেও সময় সময় এটি দেখা গেছে। নির্বাহী বিভাগের কোনো গৃহীত সিদ্ধান্ত বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলেই শুরু হয় দুই বিভাগের পারস্পরিক ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক। কয়েক বছর আগে ভারতেও এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষকরা এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক সময় বিচারিক সক্রিয়তা বলে আখ্যায়িত করেন। ১৯৯৯ সালে উচ্চ আদালতের জনস্বার্থবিষয়ক রিট করার ক্ষমতা ঘোষিত হওয়ার পর বিষয়টি অধিকতর দৃশ্যমান হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার বিভাজনে স্বীকৃত মূলমন্ত্র হলো—এক বিভাগ অন্য বিভাগের অধিক্ষেত্রে প্রবেশ বা হস্তক্ষেপ করবে না। গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনার দায়িত্ব কোনো বিভাগের একক অধিকার নয়। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে তিন বিভাগের কার্যপরিধির পূর্ণ ব্যাখ্যাও সংবিধানে দেওয়া আছে। যেমন—সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র সংসদের। অন্য কারো নয়। তবে এখানেও সীমারেখা হলো, সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোনো আইন সংবিধানসম্মত হতে হবে। কোনো আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা বিচার বিভাগ তথা উচ্চ আদালতের। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক বিদেশি কিছু রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ ওই দেশের আদালত বেআইনি ঘোষণা করেন। আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন উচ্চ আদালতে আপিল করলেও তা সম্পূর্ণ সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ আদালতের রায় মেনে নিয়েছে। ওই দেশের ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা তেমন কোনো বিতর্ক সংসদে করেননি। গণতান্ত্রিক চর্চায় এটা একটা দৃষ্টান্ত।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার মূলমন্ত্র হলো আইনের শাসন। অর্থাৎ বিদ্যমান আইন সঠিক ও সমভাবে প্রয়োগ। এর ব্যত্যয় হলেই নাগরিক অধিকার বিঘ্নিত হয় বা সংশ্লিষ্ট নাগরিক সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সংসদ আইন প্রণয়ন করলেও আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা বা দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের। বিদ্যমান আইন সঠিক ও সমভাবে প্রয়োগে নির্বাহী বিভাগ ব্যর্থ হলেই উচ্চ আদালত নাগরিকদের আইনি অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদেশ-নির্দেশ প্রদান করেন। ক্ষমতার এ ভারসাম্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই স্বীকৃত। একইভাবে সংসদ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্যও স্বীকৃত। সংসদের আইন প্রণয়নসহ নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সীমারেখা হলো—এমন কোনো আইন সংসদ প্রণয়ন করতে ক্ষমতাবান নয়, যে আইন সংবিধানপরিপন্থী। নজরদারির ক্ষেত্রে বিচার বিভাগেরও কর্মকাণ্ড সংসদ পর্যালোচনা করতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশে তিন বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমতার মূল অনুসরণীয় নীতি হলো—ক্ষমতার ভারসাম্যে অবিচল আস্থা। দেশের বিদ্যমান মূল আইন হলো সংবিধান। সংবিধানপ্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংসদ আইন প্রণয়ন করে। একইভাবে সংবিধানের ধারার আলোকেই আইন নির্বাহী বিভাগ প্রয়োগ করে বা করবে। এ নীতি যথাযথভাবে পালন করলে এক বিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগের ক্ষমতা নিয়ে কোনো বিতর্ক হওয়ার কথা নয়। সংসদ সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে। তবে এ ক্ষেত্রে সংবিধানের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। অন্যথায় উচ্চ আদালত সংসদ কর্তৃক গৃহীত সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করতে ক্ষমতাবান। এ কারণে যেকোনো সাংবিধানিক সংশোধনীর ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। জানা মতে, ভারতীয় সংবিধানের সংশোধনী সম্পর্কে ওই দেশের সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে কয়েকটি ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সেসব ক্ষেত্রে সংসদও কোনো সংশোধনী অনুমোদন করতে ক্ষমতাবান নয়।
১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগ থেকে পৃথক করার সিদ্ধান্ত হয়। দীর্ঘ ৯ বছর পর—অর্থাৎ ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা রদ করা হয়। এ ছাড়া অন্য কয়েকটি পদক্ষেপও বাস্তবায়িত হয়। একই সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রথাও প্রয়োজনের আলোকে চালু করা হয়। এ প্রথাও এখন উচ্চ আদালতের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রধান যুক্তি হলো, এ প্রথায় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক্করণের বিষয়টি সম্পন্ন হয় না বা হবে না। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ প্রথা অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এখন বিষয়টি আপিল বিভাগের বিবেচনাধীন। কিন্তু অন্যদিকে বিচার বিভাগের অধীনস্থ বিচারকদের পদায়ন, বদলি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বের বিষয়টি দৃশ্যমান। এ নিয়ে দুই বছর ধরে উচ্চ আদালত ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার বিভাজন নিয়ে বিতর্ক চলছে। এ বিষয়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি, যা সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেছেন, তা দীর্ঘ সময় ধরে গেজেটে প্রকাশ করা হয়নি। কারণ রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সময় নিচ্ছে। কয়েক দিন আগে আরো দুই সপ্তাহের সময় প্রার্থনা করা হলে উচ্চ আদালত মন্তব্য করেন যে শেষবারের জন্য সময় মঞ্জুর করা হলো। আইন মন্ত্রণালয়ের তথা নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বের অন্য একটি বিষয়ও সাম্প্রতিককালে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। কিছুসংখ্যক বিচারকের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন গ্রহণ করা হয়নি। এ সত্ত্বেও এ বিষয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হয়। জানা গেছে যে এ আদেশবলে সংশ্লিষ্ট বিচারকরা বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য দেশ ত্যাগ করেছেন। ২০০৮ সালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা রদ করার পরই ধারণা হয়েছিল যে বিচার বিভাগ স্বাধীন। এখন বলা হচ্ছে যে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়।
জুলাই মাসে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্তভাবে অবৈধ ঘোষণা দেওয়ার পর বিচার বিভাগ ও সংসদের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি পুনরায় দৃশ্যমান হয়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের মে মাসে হাইকোর্ট এসংক্রান্ত মামলায় সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এ বছর জুলাইয়ের ৩ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল ঘোষণা করার পর সংসদ ও সংসদের বাইরে তুমুল বিতর্কের বিষয়টি সংবাদমাধমে দেখা যায়। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণের ক্ষমতা সংসদে ন্যস্ত করা হয়। এ বিষয়টিই অসাংবিধানিক বলে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন। চলমান বিতর্কে কয়েকটি বিষয় বলা হয়েছে। এক. সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত সংশোধনী বাতিল করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের আছে কি না? ১ জুলাই এ প্রশ্নটিই উত্তপ্ত ও ক্ষুব্ধ সংসদে বহুল আলোচিত ছিল। দুই. ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় যে ভাষা ব্যবহূত হয়েছে, তা বিধিসম্মত হয়েছে কি না? সংসদে আলোচনার প্রধান যুক্তি ছিল : (ক) সামরিক শাসন আমলের জুডিশিয়াল কাউন্সিল কিভাবে বৈধ হয় এবং (খ) কোনো অপশক্তি আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে অসাংবিধানিক শাসনের ষড়যন্ত্র করছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রথম প্রশ্নের বিষয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন নেই। কারণ কোনো আইন বা সংবিধানসংক্রান্ত সংশোধনী সংবিধানসম্মত কি না সে বিষয়ে বিচার বিভাগের আদেশ-নির্দেশ চূড়ান্ত এবং তা মানা ও কার্যকর করাই অন্য সব বিভাগের কর্তব্য। এ ছাড়া আরো বলা যায় যে ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থায় উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা মূল সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়া হয়েছিল। এখন কিভাবে সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ যুক্তি দেখাচ্ছে, মূল সংবিধানে—অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার পথে এ রায় বাধা সৃষ্টি করেছে।
এ ছাড়া একটি দৈনিকে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী ২০১০ সালে বাতিল ঘোষিত রায়ে জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মেয়াদ ২০১১ সাল পর্যন্ত রাখার সিদ্ধান্ত ছিল। ২০১১ সালে বর্তমান সরকার ১৫তম সংশোধনীবলে এ কাউন্সিলকে সংসদ বৈধতা প্রদান করে। এখন এ কাউন্সিলকে অবৈধ বলা যায় কিভাবে। সার্বিকভাবে বলা যায় যে মিডিয়াসহ সরকারবহির্ভূত কিছু সংস্থার আলোচনা ও সংসদের মন্তব্য-বক্তব্যের অনেকটাই বিপরীতধর্মী ছিল। বিচারকদের অপসারণে সংসদের ক্ষমতা ও বিচার বিভাগের ক্ষমতার প্রথা নিয়েও কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা গেছে। এসংক্রান্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে কমনওয়েলথ জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ দেশেই এ ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে সংসদকে দেওয়া হয়নি। মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে জুডিশিয়াল কমিশন। সব পক্ষই অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে বিতর্কের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান চিহ্নিত করবে—সেটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : hazarikabd@gmail.com, Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি