বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৫)
Published : Sunday, 16 July, 2017 at 7:56 PM

আমি ছাড়া অন্যদের ডিনোফা হোটেল থেকে গ্রেফতার করা হলো

হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৫)ফেনীতে এসে প্রথমে সুফিয়ানের পিতা খালেক মিঞার পুরনো মরিস গাড়িটি ব্যবহার করি। এটা দিয়েই গাড়ি চালানো শিখি। পরে ওটাকে ফিরিয়ে দিয়ে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিঞার টয়োটা াড়িটি আনাই এবং মাস খানেক ব্যবহার করি। পরে ডাক্তার পাড়ার বেলায়েত সাহেবের ফক্সওয়াগন গাড়িটি ব্যবহার করি। অক্ষম অবস্থায় সব গাড়িই মালিকদের ফেরত দেই। ডিনোফায় থাককালে খাজা সাহেবের সঙ্গে আমাদের বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে। সভা সমিতিতে খাজা আহম্মদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করি। করিম ও ভিপি জয়নালও খাজা সাহেবের বিরুদ্ধে ছিল। এক পর্যায়ে তিনি ভিপি জয়নালসহ ও কয়েকজনকে তেল চুরির একটি মামলায় জড়িত করেন। মামলার কাগজপত্র ধ্বংস করার জন্য আসামিরা জেলখানার উত্তর দিকে একটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট সম্পূর্ণ রূপে জালিয়ে দেয়। তবুও আসামিদের সাজা হয়েছিল। মিরু ভূঁইয়া কয়েকদিন এই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে ছিল।

ডিনোফা হোটেলে থাকা অবস্থায় একটি ট্রাক থেকে বিপুল পরিমাণ আটার বস্তা আটক করেছিলাম। এগুলো ছিল অবৈধ, জাল কাগজপত্র তৈরি করে এগুলো চট্টগ্রাম থেকে চৌমোহনী নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কালোবাজারীরা এগুলো ছাড়াবার জন্য কিছু টাকা পয়সা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। আব্দুল মালেক উকিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে তার সামনেই আটাগুলো ন্যায্য মূল্যে জনগণের মধ্যে বিতরণ করি।এবং সেই টাকা আটার মালিকদের দিয়ে দিই। ইতোমধ্যে করিমও সোনাপুর বডিং-এ তার সহকর্মীদের নিয়ে অবস্থান করেছে। জুন মাসের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু নোয়াখালি এলেন। এর আগে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট গিয়ে জাফর ইমামের মাধ্যমে একটি উইলি জিপ সংগ্রহ করেছিলাম। এবং ফেনী কলেজের প্রিন্সিপাল মুজিবুর রহমানের খানের নামে এর কাগজপত্র তৈরি করেছিলাম। করিমও তখন একটি বড় ফোর্ড গাড়ি ব্যবহার করত। বঙ্গবন্ধুর সভায় সাথীদের জিপে করে নিয়ে গেলাম। যারা আমার নিত্যসঙ্গী ছিল তারা ছাড়াও মোস্তফা হাজারী ও মহিউদ্দিন একই জিপে নোয়াখালী গিয়েছিলাম। জনসভা শেষে আমি সরাসরি ফেনী চলে আসি। চৌমহনী পর্যন্ত পায়ে হাঁটার গতিতে জিপ চালাতে হলো, ফলে ফেনী পৌঁছাতে রাত হলো। খাজা সাহেব  ও করিম মাইজদিতে রয়ে গেল। খাজা সাহেব রাতেই বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন এবং আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন। শুনেছি খাজা সাহেব বঙ্গবন্ধুর পায়ে ধরেছিল। খাজা সাহেব বলেছিলেন , এদের ব্যাপারে কিছু একটা না করলে আমি ফেনীতে ফিরে যাব না। আর অপমান সহ্য করা সম্ভব নয়। তখনকার এসপি মোতালেব খাজা সাহেবের কথার সত্যতা মেনে নেওয়াতে বঙ্গবন্ধু ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন এবং ২৪ ঘন্টার মধ্যে আমাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। নোয়াখালির কচি মিঞা  এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বেরিয়েই করিমকে পেয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের কথা জানালেন এবং আমাকে অবিলম্বে খবরটি দেওয়ার জন্য বলেন। ইচ্ছা করেই  করিম সে খবরটি আমাকে দেয়নি। সে রাতে নোয়াখালিতেই রয়ে গেল। সে কোনো কিছুতে জড়িত নেই, এটা সে জেলা নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করল । সব দোষ আমার উপর চাপিয়ে দিল।

কিছুদিন আগে করিমের সঙ্গে আমার একটি বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছিল। আমরা সকল মুক্তিযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কেউই বারাহিপুরের খায়েজ আহম্মদকে আটক করব না। কিন্তু করিম তাকে আটক করলে আমি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হই। সেই ক্ষোভ থেকে সকলকে সরে যেতে বলেছিল। পরদিন সকাল ৮টায় এসডি ও মাহবুব কবির আমাকে টেলিফোন করে তার বাসায় গিয়ে নাস্তা করার আমন্ত্রণ জানায়। একই সঙ্গে কিছু জরুরি আলাপের কথাও বলেন।। দুমিনিটের মধ্যে তার বাসায় পৌঁছালাম। ড্রয়িং রুমেই পৌঁছাতেই মাহবুব কবির এসপি মোতালেব এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ভালো করে পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার আগেই এসপি প্রশ্ন করে জিপটি নিয়ে এসেছেন তো? মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি ঘটনা কিছু খারাপ আছে। এসপি সাহেব কিছুক্ষণ শুধু জিপের তথ্য নিলেন। মুহবুব কবিরের বাসায় পৌঁছানোর পরপরই পুলিশ ডিনোফা হোটেলে অভিযান শুরু করে। আমাকে না দেখে সঙ্গীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। তারা বিস্মিত ও হতচকিত হয়ে পড়ে। সেখানে থাকা আমার সাত আটজন সহকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। অভিযানের মাঝামাঝি সময়ে সেলিম, মহিউদ্দিন, শাহাজান কবির ও কায়ুম সেখানে গেলে পুলিশ তাদেরকেও গ্রেফতার করে। দশটার দিকে আমাকেও পুলিশ থানায় আনে। থানায় আনা পর্যন্ত পলিশ যথেষ্ট সম্মানের সাথে কথা বলছিল। কিন্তু থানায় এলে ওরা আমাকে সাধারণ আসামিদের সঙ্গে লক আপে ঢুকতে বলে। এতে আমি কিছু বলার আগেই আমার সাথীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ওদেরকে শান্ত করে নিজেই লক আপে ঢুকে পড়ি। বেলা বারোটার দিকে প্রায় হাজার খানেক পুলিশ আমাদেরকে নিয়ে নোয়খালীর উদ্দ্যেশ্য রওনা হয়। বঙ্গবন্ধুর সভায় ডিউটি করার জন্য আশেপাশের জেলা থেকে যেসব পুলিশ আনা হয়েছিল পরদিন তাদের সকলকে এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়। এদিকে আমার গ্রেফতারের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর মালেক উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে করিম বেলা দশটার দিকে নোয়াখালী ফেনীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। চৌমুহনী পার হয়ে সেনবাগের কাছে এলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে আমাদেরকে একসাথেই জেলে পাঠিয়ে দেয়। বেলা তিনটার দিকে আমরা জেল গেটে এসে পৌঁছাই।
চৌমুহনীতে কয়েক শ লোক গাড়ি আটক করে আমাদেরকে গালাগাল করতে থাকে। ওখানে রাস্তা পরিস্কার করতে আধঘন্টাও বেশি সময় লেগেছিল। ডিনোফা হোটেলে থেকে আমাদের সব আসবাবপত্র পুলিশ থানায় নিয়ে এসেছিল। অ্যাকেরিয়ামসহ বিদেশি মাছগুলো এবং হরিণটিকে থানায় নিয়ে আসে। আমার কক্ষের সামনে ওয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দুটি তাজা রকেট বোমা রাখা ছিল। এগুলো থানায় নিয়ে যাবার জন্য আমি আগেই খবর দিয়েছিলাম। পুলিশ এসে সেগুলো দেখে গিয়েছিল । কিন্তু নিয়ে যায়নি। বলেছিল পরে নেবে। এগুলো রাধাবাবুর ভাই সুনিলসহ কয়েকজন খেলোয়াড় রেখে গিয়েছিল। ফেনী স্টেডিয়ামের ফুটবল খেলার সময় এগুলো তাদের পায়ে- আঘাত করে। মাটি খুঁড়ে তুলে আনলে দেখা গেল-এগুলো রকেট বোমা।

তাই ওরা সেগুলো আমার কাছে দিয়ে যায়। দুপুর থেকে খাজা সাহেবের লোকজন জড় হতে থাকে। রাজাকার আলবদররাও ওদের সঙ্গে আনন্দ মিছিলে যোগ দিল। মাইকে প্রচার হলো বিকেলে শুকরিয়া সভা হবে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য মাইকে অনুরোধ করা হলো। বিকেলে জনসভায় খাজা সাহেব বলেন, আজ আমরা সবাই এসডিও মাহবুব কবিরের জন্যই বেঁচে আছি। আপনারা তার জন্য দোয় করবেন। এসডিও যদি সকালে হাজারীকে তার বাড়ি ডেকে না নিত তাহলে গ্রেফতারের আগে হোটেলে থাকা রকেট বোমাগুলো নিক্ষেপ করতই। আর ওই দুটো বোমার একটা ফাটলেই ফেনী শহরের বিশাল অংশ দীঘির মতো হতো। এতে কত লোক যে মারা যেত তার কোনো ইয়ত্তা নেই। মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। খাজা সাহেব বলেন, আপনারা নিশ্চই রকেট বোমাগুলো দেখেছেন?
মধুপুরে জমি নিয়ে বিরোধে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। বাদী পক্ষ নালিশ করতে এসে আমাকে দেখানোর জন্য কিছু রক্তমাখা জামাকাপড় এনেছিল। যাওয়ার সময় সেগুলো নিচ তলার সিঁড়ির কাছে ভুলক্রমে রেখে গিয়েছিল। পুলিশ ওই রক্তাক্ত জামাকাপড়েও নিয়ে গিয়েছিল। ওই গুলোর উল্লেখ করে খাজা সাহেব বলেন ওই জালেম কত মেয়ের ইজ্জত লুঠেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমার অ্যাকোরিয়ামের রঙিন মাছগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন ওই বিষাক্ত মাছগুলোর কামরে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই কথাগুলোই গ্রামগঞ্জে অতিদ্রুত প্রচার করতে থাকল।







সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। সৈয়দ রেফাত সিদ্দিকী (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মোঃ যোবায়ের (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৯২২৭৮৭২৭৮।
বার্তা বিভাগ: ৮১১৯২৮০, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০২-৮১৫৭৯৩৯ ই-মেইল : news.hazarika@gmail.com, বিন : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি