বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৪)
Published : Saturday, 15 July, 2017 at 6:34 PM

হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৪)৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় শহরে এলাম, শহীদ মিনারে দেখলাম ইলিয়াসের ঝুলন্ত লাশ
শুক্রবার বাজার এলাকায় সিভিল ডিফেন্স গঠিত হওয়ার পর আমার তৎপরতা অনেক বেড়ে গেল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে এই বাহিনী শক্তিশালী হয়ে উঠ। ৬ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় এদেরকে নিয়ে পায়ে হেঁটে ফেনীর উদ্দেশ্য রওনা হই। টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কাছে ১ ঘন্টার যাত্রা বিরতি হয়। কারা যেন বলেছিল এখানে রাজাকার আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা টিচার্স ট্রেনিং কলেজটি ঘেরাও  করি। সেখানে কাউকে পেলাম না। তবে একটি কক্ষের মেঝেতে কিছু তাজা রক্ত দেখা গেল। তারপরই আমরা সবাই লাইন ধরে চলে গেলাম মডেল স্কুলের কাছে। বিকেল ৫টায় সেখানে পৌঁছালাম।

২০ কিলোমিটার রাস্তায় জনতার প্রাণঢালা অভিনন্দন পেলাম। প্রথম দিকে সবাই মাটিতে বসে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। দুপুরে খাওয়া হয়নি তাই বিকেলে কিছু কলা ও পাউরুটি আনিয়ে নিলাম। রাতের খাওয়াটাও সেটা দিয়ে চালিয়ে দিলাম। আমাদের গ্রামের লোকজন এসে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করছিল। তাদের কাছ থেকেই গত সাত-আট মাসে খবর পেলাম। সন্ধ্যার কিছু পরে সবাইকে নিয়ে ফেনী কলেজ চত্বরে এসে সহ যোদ্ধাদের সাউথ হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করি। সাউথ হোস্টেল সংলগ্ন দক্ষিণ পশ্চিম দিকে পাইলট হাইস্কুলের হেডমাস্টারের জন্য একটি নতুন ঘর তৈরি করা হয়েছিল। আমি সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করি। প্রথম রাতে থাকা-খাওয়ায় সবারই কিছু কষ্ট হলো। পরদিন থেকে  সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকে। এখানে থাকাকালে বিভিন্ন এলাকার অগুণিত মানুষ তাদের সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসতে লাগল। তখনও পর্যন্ত অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ ফেনীতে আসেনি। কয়েকদিন পর করিমও ভিপি জয়নাল এলো। খাজা সাহেব এসেছিলেন দিনের প্রথম ভাগে। আমার সদলবলে ফেনী আগমণ তিনি ভালো চোখে দেখলেন না। তার সাথে আমার কোনো প্রকার যোগাযোগ হলো না। এদিকে আমরা প্রধানত পাক-সেনাদের দোসর রাজাকারদের খবর নিচ্ছিলাম। আমরা ঘেরাও দিয়ে কিংবা লড়াই করে কোনো রাজাকার ধরিনি। সাধারণ মানুষেই এদেরকে ধরে এনে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। তখন বাস্তবে কোনো আইনশৃঙ্খলা ছিল না। তবু আমি এদের একজনকেও হত্যা করিনি। ডিসেম্বরের শেষের দিকে পুলিশদের জড়ো করে থানা চালু করি এবং ওদের মাধ্যমে রাজাকারদের মামলা দিয়ে জেলে পাঠাই। কুখ্যাত রাজাকার নূর ইসলাম হোস্টেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

আমরা যখন শহীদ মিনার অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিলাম তখন শহীদ মিনারে বেদির সঙ্গে রামপুরের ইলিয়াস, বালিগা’র হানিফ ও অন্য একজনের লাশ ঝুলছিল। এদের মুখে সিগারেট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইলয়াস দাগন ভূঁইয়ায় ধরা পড়ে গণপিটুনিতে মারাত্মক আহত হলে তাকে ফেনী নিয়ে আসা হয়। সে জেল গেটে মৃত্যুবরণ করে। এদের লাশ উৎসুক জনতাই শহীদ মিনারে টাঙিয়ে রাখে। আমার আগমনের কথা শুনে ইলিয়াসের আত্মীয়-স্বজনরা লাশ নিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছিল না। আমি ওদের জানিয়ে দিলাম পরিবারের লোকেরা ইচ্ছা করলে লাশ নিয়ে যেতে পারে। কিছুদিন পর ইলিয়াসের ভাই মুছা, হোসেন ও কালা মিঞাকে কোম্পানিগঞ্জে গিয়ে ভিপি জয়নাল হত্যা করে। যদিও এদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতার কোনো প্রমাণ ছিল না। তবে ওই এলাকায় পাকিস্তানপন্থি বা স্বাধীনতাবিরোধী এলাকা বলে পরিচিত ছিল। কলেজ হোস্টেলে সোনাপুরের কমু মিঞা, ভেলু মিঞাসহ অনেকেই কয়েকদিন আটক ছিল।

এদের দু-একজনকে জিম্মায় ছেড়ে দিলাম। কিছু লোককে থানাতে পাঠিয়ে ছিলাম। কিছু ছেলে সোনাপুরের আলম স্যারকেও ধরে নিয়ে এসেছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সসম্মানে মুক্তি করে দেই। প্রায় মাসখানেক আমরা কলেজে আস্তানা গড়েছিলাম। অন্তহীন সমস্যার মানুষদের ভালো-মন্দ সবকিছু আমাদেরকে দেখতে হতো। আমাদের সঙ্গে বি এল এফ বাহিনীর অনেকটা দূরত্ব ছিল। এখানে কাজী নুরুনবী, মোতালেব এবং ভিপি জয়নাল এই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল। শুধু ফেনীতে নয়, সারাদেশেই এরা রব ও জলিলের সঙ্গে ভিড়ে যায়। পরে এদের দিয়েই সিরাজুল আলম খান জাসদ গঠন করেন। প্রথম দিকে সরকার দেশের প্রশাসন ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সকল এলাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণ করত। ভারতীয় বাহিনী তখনও বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান করছিল।

১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু দেশে এলে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীকে ভারতে পাঠাতে সক্ষম হলেন। অল্প কিছুদিন পরেই মুক্তিযোদ্ধাদেরও অস্ত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানালেন। সেই মোতাবেক ছাগলনাইয়ার ক্যাম্পে আমরা আমাদের অস্ত্র জমা দিলাম। অস্ত্র জমা দিয়ে শুধু ১০ জনকে রেখে অন্যদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। এদের কয়েকজনকে রক্ষীবাহিনীতে ঢুকিয়ে দিলাম। অস্ত্র জমা দেওয়ার দুদিন পর কলেজ এলাকা ছেড়ে আমরা জেলখানার পাশে ডিনোফা হোটেলের দোতোলার পূর্বদিকের অংশ ভাড়া নিই এবং এখানেই আমরা আমাদের আবাস স্থাপন করি।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। সৈয়দ রেফাত সিদ্দিকী (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মোঃ যোবায়ের (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৯২২৭৮৭২৭৮।
বার্তা বিভাগ: ৮১১৯২৮০, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০২-৮১৫৭৯৩৯ ই-মেইল : news.hazarika@gmail.com, বিন : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি