বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৩)
Published : Friday, 14 July, 2017 at 7:51 PM

হাজারীর আত্মজীবনী (পর্ব-৩৩)খাজা আহম্মদের ক্যাম্প লুট, মুক্তাঞ্চলে সিভিল
 ডিফেন্স গঠন, সরদার সাহেবের মৃত্যু
সাবসেক্টরের দায়িত্ব পেয়েই জাফর ইমাম প্রায়ই খাজা আহম্মদের কাছে টাকা-পয়সা ও খাদ্যদ্রব্য চাইত। প্রথমদিকে তার দাবি মেলালেও মাস খানেক পরে খাজা আহম্মদ সবকিছু বন্ধ করে দেয়। এতে জাফর ক্ষুদ্ধ হয়। আমি ট্রেনিং শেষে রাজনগর সেক্টরে যোগ দিলে জাফর ইমাম খাজা আহম্মদের বিরুদ্ধে আমাকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে। অবশ্য অপমানজনকভাবে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার কারণে নিজে থেকেই ক্ষুদ্ধ ছিলাম। আমিও রাজনগরে যোগ দিয়েছি শুনে খাজা আহম্মদ বিচলিত হলেণ। আমার যোগ দেওয়ার দুদিন আগে জাফর ইমাম খাজা আহম্মদের ক্যাম্প আক্রামণ করে সেখানকার খাদ্যদ্রব্য সব লুঠ করে নিয়েছিল। জাফরের সঙ্গে সম্পর্ক আমার ভালোই ছিল। যেদিন সন্ধ্যায় কাজে যোগ দিলাম সেদিনই আমাদের পুরো গ্রুপটাকে হঠাৎ করে রাতে অন্ধকারে মুহুরী নদীর পাড়ে সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো- পাকবাহিনী মুক্তাঞ্চল আক্রমণ করেছে। আমরা মুহুরী নদীর উত্তর দিকে অবস্থান করি। পাকবাহিনীর অবস্থান ছিল দক্ষিণ দিকে।

সারারাত দুপক্ষের গুলি বিনিময় হলো। আসলে প্রতি রাতেই এখানে দুপক্ষের গুলি বিনিময় হয়। সকালে জাফর ইমাম রাজনগর ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য খবর পাঠায়। সেখানে গেলে তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে বড় কাছারি চলে আসেন এবং এখানকার যাবতীয় তথ্য দেন। দুতিনদিন বড় কাছারি ও রাজনগরে কাটালাম। আসলে প্রথমদিন আমাদেরকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল মনোবল যাচাই করার জন্য। পরশুরামের ১ নম্বর শুবার বাজার ইউনিয়ন সম্পূর্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে ছিল। এখানে মহুরী নদীর উত্তর দিকে মুক্তিযোদ্ধারা বাষ্কার  বানিয়ে শক্তিশালীভাবে অবস্থান করছিল। প্রথমদিকে দিকে মহুরী নদীর উত্তর দিকটাকে পাকবাহিনী ভারতের অংশ ভেবেছিল। কিন্তু পরে প্রবল প্রতিরোধের মুখে অনেক চেষ্টা করেও তারা এই এলাকায় ঢুকতে পারেনি। এখানে এসে প্রথমদিকে রকিব, আজু, সাহাবুদ্দিন, আকবর,ও পিন্টুসহ পূর্ব পরিচিত কয়েকজনের সাথে দেখ হয়। এখানে মূলত সাবে সেনাবাহিনী ও ইপিআর-এর লোকেরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করত। আমি একমাত্র ব্যক্তি যে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে ওই জায়গায় কাজ শুরু করছি। এখানে কাজ করতে গিয়ে লক্ষ করি মুক্তিযোদ্ধারা এখানে সাধারণ মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। গরু, ছাগল, পুকুরের মাছ, আগেই সব শেষ। নারী নির্যাতনের কথাও কানে এলো।

ব্যাপারটি আমাকে ভীষণ উদ্বিগ্ন করে। কিছু কিছু কথা জাফর ইমামের কানেও দিলাম। কিন্তু কোনো ফল হলো না। এখানে মানুষ এতদিন তাদের দুঃখের কথা বলার কাউকে পায়নি। আমি আসার পর আস্তে আস্তে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ শুর হয়। এখানে কয়েক শ বেকার যুবককে নিয়ে সিভিল ডিফেন্স গঠন করি। পিন্টু ও হামদামসহ প্রায় দুশত যুবক এতে যোগ দিয়েছিল। এদের জন্য নামমাত্র ভাতা ও খাওয়ার জন্য টাকা-পয়সার বরাদ্দ পেয়েছিলাম। এই সংগঠনের তৎপরতা দেখানোর জন্য শুবার বাজারে খালেদ মোশাররফকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলাম। ওইদিন বাজারের প্রতিটি ঘর ও গাছের উপরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়েছিলাম। ছেলেদের শৃঙ্গলা ও আমার বক্তব্য শুনে তিনি খুশি হলেন। কিন্তু যখনই বুঝতে পারলেন এক হাজার গজের মধ্যে পাকসেনারা অবস্থান করছে, তখন তিনি কিছুটা বিচলিত হলেন। এখানকার বেকার যুবকরা সংগঠিত হয়েছে দেখে যারা অপকর্মে জড়িত ছিল তারা আপনা  থেকেই শুধরে গেল । সুবেদার মাইজুর রহমান সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল। তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা এখানকার প্রতিটি বাড়ি এক একটি বাষ্কারে পরিণত হলো। ৩ ডিসেম্বর খবর এলো পাকবাহিনী পরশুরাম ছেড়ে চলে গেছে। এদিককার লোকজনও পরশুরাম বাজারে ঘুরে এসে ওখানকার বর্ণনা দিল। দক্ষিণ দিক থেকে গুলির আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। এমন সময়ে একদিন সর্দার সাহেব তার বাড়ির পুকুর ঘাটে বসেছিলেন, সঙ্গে ছোট ছেলে ইমতিয়াজও ছিল। বড় ছেলে রিয়াজ বাড়িতে থাকত না। পাকসেনাদের পিছু হঠার কথা শুনে খুব হাসছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন।

এবং ৫ মিনিটের মধ্যে মৃত্যুমুখে পতিত হন। খবর শুনে হাজার হাজার মানুষ রাতেই সেখানে ভিড় করে। পরদিন সকালে জানাযাতেও বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তার পাশের ঘরেই আমি থাকতাম। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে আমি ছিলাম রাজনগরে। খবর পেয়ে ছুটে এলাম। এই মানুষটি এলাকার সকলের প্রিয় ছিল। মাত্র কয়েকটি দিনের জন্য পরিপূর্ণ স্বাধীনতার খবরটি শুনে যেতে পারল না। রকিবদের যে ঘরে আমি থাকতাম সেখানে এক বয়স্ক বিধবা মহিলা রান্না-বান্নাসহ যাবতীয় কাজ করত। ওই সময়ে সে ঘরে কেবল রকিব আর আমি থাকতাম। অনেক রাতে ফিরলেও ঘরে ঢুকতে কোনোদিন ডাকাডাকি করতে হয়নি। নিঃসন্তান এই মহিলা আমাদেরকে ওর সন্তানের মতোই দেখত। আমরাও খুব সমীহ করতাম এবং কোনোদিন ওকে কাজের লোকের মতো দেখিনি। স্বাধীনতার অল্প কয়েকদিন পর মহিলা মৃত্যুবরণ করে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। সৈয়দ রেফাত সিদ্দিকী (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মোঃ যোবায়ের (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৯২২৭৮৭২৭৮।
বার্তা বিভাগ: ৮১১৯২৮০, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০২-৮১৫৭৯৩৯ ই-মেইল : news.hazarika@gmail.com, বিন : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি