সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০
সন্ত্রাস নয়, দেশে দায়িত্বশীল বিরোধী দল দরকার
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 15 November, 2020 at 7:00 PM

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ১০টি বাসে অগ্নিসংযোগের পর শুক্রবার ইন্দিরা রোডে পাঁচটি ম্যানহোলে পরপর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে বাস পোড়ানোর মতো এই বিস্ফোরণেও কেউ হতাহত হয়নি। বিএনপির ঘোষিত সরকারবিরোধী আন্দোলনের এটা সূচনা কি না, তা কে বলবে? গতকালই ছিল ঢাকায় বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশের দিন। আজ (রবিবার) তা সারা দেশে হবে। এই বিক্ষোভ ও সমাবেশের ‘শুভ সূচনা’ এই সন্ত্রাস দ্বারা ঘটানো হলো কি না, তা বিএনপির নেতারাই বলতে পারবেন।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, বিএনপি জাতীয় সংসদের ঢাকা-১৮ এবং সিরাজগঞ্জ আসনে নির্বাচন চলাকালেই তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই আন্দোলনের কর্মসূচির মধ্যে প্রথমে ঢাকায় এবং পরে সারা দেশে হরতাল ডাকারও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যুবদল হঠাত্ বাস পোড়ানোর সন্ত্রাস করায় এবং হরতাল ডাকার পরিকল্পনাটি আগেই পুলিশের কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বিএনপির নেতৃত্ব বেকায়দায় পড়েন। তারা এখন ঢাকা ও সিরাজগঞ্জের উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে ধুয়া তুলে বিক্ষোভ ও সমাবেশের মধ্যে তাদের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

বৃহস্পতিবারের বাস পোড়ানো এবং শুক্রবারের ইন্দিরা রোডের ম্যানহোলে বিস্ফোরণের ঘটনা একই সূত্র থেকে ঘটানো হয়েছে বলে পুলিশ-র্যাব নাকি জানতে পেরেছে। পুলিশ এই সূত্রের নাম এখনই প্রকাশ করছে না। তবে ধোঁয়া দেখে যেমন বোঝা যায় নিচে আগুন আছে, তেমনি ঢাকায় বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের সন্ত্রাসের ধরন দেখেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এই পুরোনো সন্ত্রাসী অভ্যাসটি কোন রাজনৈতিক অশুভ চক্রের।

হতাশা থেকে যে ডেসপারেসি মানুষের মনে আসে, তা রাজনৈতিক দলের মধ্যেও আসতে পারে। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের সময় সারা ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি অবিভক্ত শক্তিশালী দল ছিল। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দেশভাগের সব মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ায় তারা হতাশ হন। পি সি যোশীর মতো এক অভিজ্ঞ নেতাকে দলের নেতৃত্ব থেকে তাড়িয়ে ডাঙ্গে তা দখল করেন এবং ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়’ স্লোগান দিয়ে সন্ত্রাসের রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নেহরুর সরকার সুযোগ পেয়ে কম্যুনিস্ট পার্টিকে সন্ত্রাসীদের দল আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভারতে কম্যুনিস্টদের ‘লাল বিপ্লবের’ সেখানেই অবসান।

সারা ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টিতে তখনই ভাঙনের শুরু। এই একটি পার্টি থেকেই সিপিএম এবং চারু মজুমদার ও কানু সান্যালের নকশাল এবং মাওবাদী গ্রুপগুলোর জন্ম। সিপিএম বেঁচে যায় সন্ত্রাস ত্যাগ ও সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থা স্থাপন করে। নকশাল ও মাওবাদী সন্ত্রাস আঁতুড়ঘরেই মারা যায়। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার কঠোর হাতে নকশাল সন্ত্রাস দমন করায় এবং চারু মজুমদার জেলে বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়ায় কিছু বাম বুদ্ধিজীবী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র হত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন। তা ভারতের জনগণের সমর্থন পায়নি। চারু মজুমদার ও কানু সান্যালের মতো ইতিহাস সৃষ্টিকারী দুই নেতাই আজ ইতিহাস।

একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং পাকিস্তানিদের গণহত্যায় শরিক হয়ে জামায়াতের মতো অর্থশালী ও বিত্তশালী দলের আজ কী অবস্থা! জনগণের কাছে তাদের যা ঘৃণিত অবস্থান, তা দেখেও বিএনপি নিতাদের কোনো হুঁশ হয়নি। ক্ষমতা দখলের সাময়িক সুবিধা লাভের আশায় জামায়াতের সঙ্গে ‘আত্মীয়তা’ এবং জামায়াতের সন্ত্রাসী রাজনীতি গ্রহণ করায় আজ বিএনপির এই অবস্থা। এজন্য আওয়ামী লীগ সরকারের দমননীতিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী রাজনীতি দমন করবেই।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর একজন মাত্র নেতাকে (মহাত্মা গান্ধী) হত্যা করায় তত্কালীন নেহরু সরকার সারা ভারতে হিন্দু মহাসভা দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বাংলাদেশে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে জাতির পিতা ও জাতীয় নেতাদের হত্যায় ষড়যন্ত্রের যোগসাজশ এবং শয়ে শয়ে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার অভিযোগ। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধ রয়েছে আওয়ামী লীগসহ বিরোধীদলীয় অসংখ্য নেতা-কর্মী হত্যা এবং বিরোধী দলে থাকার সময় জামায়াতের সহযোগে আন্দোলনের নামে তিন বছর যাবত্ রাজপথে আগুনে পুড়িয়ে শয়ে শয়ে নিরীহ নরনারী হত্যার গুরুতর অভিযোগ। শুধু এই সন্ত্রাসের জন্যই যে কোনো দেশের যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ দল ঘোষণা করত। আওয়ামী লীগ বা মহাজোট সরকারও তা করেনি। এমনকি জামায়াতের মতো স্বাধীনতার শত্রু এবং মানবতার শত্রু দলটিকেও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ দল ঘোষণা করা হয়নি। কেবল তাদের সন্ত্রাসী রাজনীতিকেই কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। এটা জনস্বার্থেই যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার করে।

বিএনপি যদি একটি নিয়মতান্ত্রিক দায়িত্বশীল দলের ভূমিকা গ্রহণ করে, তাহলে এই নিয়মতান্ত্রিক বিরোধিতার সব অধিকার বিএনপিকে দিতে আওয়ামী লীগ সরকার বাধ্য। এই বাধ্যবাধকতা না মানলে জনগণই তাদের ক্ষমতার গদি থেকে টেনে নামাবে। যেমন অতীতে নামিয়েছে এরশাদ ও খালেদা জিয়ার স্বৈরাচার সরকারকে। কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করেও তারা ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের বেলায়ও যদি জনগণ দেখত অকারণে তারা বিরোধী দলের ওপর দমননীতি চালাচ্ছে, তাহলে তারা শেখ হাসিনাকে পর্যায়ক্রমে তিন দফা ক্ষমতায় থাকতে দিত না। যেমন দেয়নি খালেদা জিয়াকে।

ঢাকায় সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী ঘটনাই প্রমাণ করে, বিএনপি যেমন জামায়াতের সংশ্রব ছাড়েনি, তেমনি ছাড়েনি সন্ত্রাসের রাজনীতিও। তারা ভারতের মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টি ও ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির (সিপিআই) মতো সন্ত্রাসের রাজনীতি পরিহার এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসুন। জামায়াত ও জিহাদিস্টদের সংশ্রব ত্যাগ করুন। আওয়ামী লীগের বিরোধিতার নামে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধিতা ত্যাগ করুন। পাকিস্তানের মিলিটারি গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশ পালন বর্জন করুন। তাহলে তারা দেখবেন, দেশের বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণ তাদের গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করেও লাভবান হচ্ছে না।

সত্য সত্যই আজ বাংলাদেশের একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক বিরোধী দল দরকার। দীর্ঘকাল একটানা ক্ষমতায় থাকলে যে কোনো দলেই স্বৈরাচারী প্রবণতা ও দুর্নীতি দেখা দেয়। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ও ক্যারিশমার জোরে আওয়ামী লীগ এখনো টিকে আছে এবং ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু তিন দফা পরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের অধিকাংশ এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, এমনকি কোনো কোনো মন্ত্রী-উপমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের কারো কাছে জবাবদিহি নেই। কারণ জাতীয় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই।

এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। এই পরিবর্তন ঘটাতে পারে জাতীয় রাজনীতিতে এবং সংসদে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল। জওহর লাল নেহরু যখন প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ভারতের পার্লামেন্টে তেমন বিরোধী দল ছিল না, তখন তিনি সূর্যোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকে ডেকে এনে বলেছিলেন, ‘জয়প্রকাশজী, আপনি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করুন। নইলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়লে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে তা পূর্ণ করবে কোনো গণতান্ত্রিক দল নয়, পূর্ণ করবে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক দল।’ নেহরুর এই সতর্কবাণী আজ সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। কিন্তু তারপর কী? বঙ্গবন্ধুর আমলে জাসদের বালখিল্য রাজনীতির ফলে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রাদায়িক রাজনীতির শূন্যতা পূরণ কোনো বিকল্প বাম গণতান্ত্রিক দল করতে পারেনি। পূর্ণ করেছিল বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক সহিংস জোট। বর্তমানেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। জাসদ এখন সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে এলেও দলটি বিভক্ত এবং দুর্বল। আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়ে তাদের নির্বাচনের নদী পার হতে হয়। বাম গণতান্ত্রিক শিবির ততোধিক বিভক্ত ও দুর্বল। সিপিবি ও সুশীল সমাজের একমাত্র রাজনৈতিক মূলধন হাসিনাবিরোধী ও বিদ্বেষী প্রচার। এই ব্যক্তিগত অসুরায় ভুগতে গিয়ে ড. কামাল হোসেনদের রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির একমাত্র শিবরাত্রির সলিতা এখন শেখ হাসিনা। গণতন্ত্রকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন এবং এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু তারপর? বাম গণতান্ত্রিক দলের নেতারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখুন। এখনো সময় আছে।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি