শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০
আমেরিকার নির্বাচনে বিশ্বের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 8 November, 2020 at 7:27 PM

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখনো ঝুলে আছে। অর্থাৎ, আমি এই লেখা যখন লিখছি (লন্ডন সময় শনিবার সকাল), তখনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বিজয়ী বলে ঘোষিত হননি। আমেরিকান গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য যে শিষ্টাচার, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার আভাস পাওয়ামাত্র পরাজিত প্রার্থী বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে নির্বাচনকালীন ভেদাভেদ ভুলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান, এবার সেই শিষ্টাচার রক্ষিত হবে বলে মনে হচ্ছে না। জো বাইডেন জয়ী হতে চলেছেন—এই আভাস পাওয়া সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নন। তিনি নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে মিথ্যাচার শুরু করেছেন। নির্বাচনে জো বাইডেন যদিও জয়ের পথে এগিয়ে, তবু ট্রাম্পের চাইতে তার ভোটের ব্যবধান খুব একটা বেশি নয়। ভোট গণনাও দু-একটি রাজ্যে শেষ হয়নি। এজন্য জো বাইডেন এখনই নিজেকে জয়ী দাবি না করে শেষ ভোটটি গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার সমর্থকদের শান্ত থাকতে বলছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের খালেদা জিয়ার কায়দায় ‘এই নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে’, ‘আমার জয় ছিনতাই করা হয়েছে’ ইত্যাদি বলে লম্ফঝম্ফ করতে শুরু করেছেন। তবে বাংলাদেশের একশ্রেণির মিডিয়ার মতো আমেরিকার মিডিয়া আবার আগে ‘নিরপেক্ষ’ নয়। তারা সমস্বরে বলছেন, ট্রাম্প ও তার সমর্থকেরা যা বলছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
লন্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘প্রেসিডেন্ট অব ক্যাওস অ্যান্ড করোনা ভাইরাস,’ অরাজকতা ও করোনা ভাইরাসের প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশে খালেদা জিয়া প্রলয়ংকর ঝড় সঙ্গে নিয়ে প্রথমবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বলে জনগণ তার নাম দিয়েছিল ‘তুফানি বেগম’। করোনা ভাইরাস যেমন দুনিয়া থেকে যেতে চাইছে না, ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেমনি ক্ষমতা ছেড়ে যেতে চাইছেন না। জো বাইডেনের কাছে সুস্পষ্টভাবে পরাজিত হলেও তিনি শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা ছাড়তে চাইবেন মনে হচ্ছে না। ট্রাম্পের পরাজয়ের সম্ভাবনার মুখেও তার সমর্থকেরা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর সমর্থকদের পাশাপাশি ভিকটোরি র্যালি করছেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থক বিজয় সমাবেশের টেলিস্ট হচ্ছে, তারা অস্ত্র হাতে মিছিলে বেরোচ্ছেন এবং স্লোগান দিচ্ছেন ট্রাম্পকে তারা হোয়াইট হাউজে রাখবেন। নইলে দেশে রক্তগঙ্গা বইবে। এই স্লোগান গত শতকের প্রথম ভাগে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হিটলারের নািস দল দিয়েছিল। ভিকটোরি অর ব্লাডবাথ বিজয় অথবা রক্ত্লান। নির্বাচনে তথাকথিত বিজয়লাভের পরেও নািস দল জার্মানিতে রক্তের বন্যা বইছে দিয়েছিল। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখনো রক্তপাত হয়নি। যে কোনো সময় হতে পারে। অশান্তি দমনের জন্য পুলিশ এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক লোককে গ্রেফতার করেছে। ট্রাম্প হয়তো আশা করে আছেন, বাইডেনের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান কম-বেশি যা-ই হোক, তিনি উপকথার মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের মতো বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করতে থাকবেনই। তাতে সুপ্রিম কোর্ট কান দেবে এবং তার বংশবদ বিচারকদের সাহায্যে জর্জ বুশ জুনিয়রের মতো নির্বাচনে জয়ী বলে ঘোষিত হতে পারবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটা অংশের মতে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমেরিকায় জনরোষ এত প্রবল যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অনেকে তার দ্বারা নিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এবার তার পক্ষাবলম্বন করতে চাইবেন কি না, সন্দেহ। সুপ্রিম কোর্টের সাহায্য পান বা না পান, ট্রাম্প সহজে হোয়াইট হাউজ ছাড়তে চাইবেন বলে মনে হয় না। তার পেছনে হোয়াইট সুপ্রিমেসিতে বিশ্বাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের সমর্থন আছে, এটা জেনে তিনি নির্বাচনে পরাজয় না-ও মেনে নিতে পারেন। তার উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতিতে শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের বিরাট অংশের মধ্যে বিরাট উত্তেজনা বিরাজ করছে। অন্যদিকে আমেরিকার প্রগতিমনা শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায় অভিবাসী ও বিরাট অশ্বেতাঙ্গ মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী। ট্রাম্প যদি তার সমর্থকদের উসকে দেন, তাহলেই আমেরিকায় একটি সিভিল ওয়ার শুরু হতে পারে। যদি তা শুরু হয়, তাহলে আমিরিকার ঐক্য বজায় থাকবে না। এমনিতেই ট্রাম্পের রক্ষণশীল বর্ণবাদী নীতি আমেরিকার জনগণকে মানসিকভাবে বিভক্ত করে ফেলেছে। সিভিল ওয়ার হলে এই ঐক্য সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের মতো ভৌগোলিকভাবেও ভেঙে যাবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আরেকটা অংশের মতে, আমেরিকার বর্তমান পরিস্থিতি সিভিল ওয়ার পর্যন্ত গড়াবে না। ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন, শেষ পর্যন্ত লেজ নামিয়ে হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন। তার চারপাশে সমর্থকের সংখ্যা দ্রুত কমছে। পতিত সূর্যের উপাসনা এখন আর কেউ করতে চাইছে না। অন্যদিকে তার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। যদিও ট্রাম্পের অনুগত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এখনো কিছু বলছেন না, কিন্তু জার্মানি ট্রাম্পকে মাথা ঠান্ডা করতে উপদেশ দিয়েছে। সম্ভবত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও একই কথা বলবে। এবার রাশিয়ার পুতিনও ট্রাম্পের পাশে নেই। সুতরাং আখেরে তাকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শান্তিপূর্ণভাবেই হোয়াইট হাউজ ত্যাগে রাজি হতে হবে। তবে ট্রাম্প যেভাবেই হোয়াইট হাউজ ত্যাগ করুন, পেছনে রেখে যাবেন করোনায় বিধ্বস্ত এবং ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত না হলেও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ দ্বিধাবিভক্ত এক আমেরিকা। জো বাইডেন কি পারবেন এই বিভক্তিতে দেশকে জোড়া লাগাতে?
অনেকের বিস্ময়, এত অনাচার করার পরেও ট্রাম্প এত ভোট বাগালেন কীভাবে? এর সহজ উত্তর হলো, এখানে কোনো জাদুবিদ্যা নেই। আছে সহজ গণনা। ট্রাম্প হিটলারের ‘নীল রক্তের অধিকারী জার্মানরাই বিশ্বের সেরা জাতি’ স্লোগানের মতো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধ্বনি তুলে এবং অভিবাসী ও কালো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিটলারের ইহুদিবিদ্বেষ প্রচারের মতো বিদ্বেষ প্রচার করে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের এক বিরাট অংশের সমর্থন ধরে রাখতে পেরেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি একচেটিয়া ভোট পেয়েছেন আমেরিকার অত্যন্ত শক্তিশালী ইহুদি সম্প্রদায়ের। জেরুজালেম ইসরাইলকে দান করে এবং সৌদি আরবসহ অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রকে ইসরাইলের সঙ্গে মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় বাধ্য করে ট্রাম্প গোটা বিশ্বের ইহুদিদের সমর্থন লাভ করেছেন। আমেরিকার ইহুদি সম্প্রদায় অর্থেবিত্তে অত্যন্ত শক্তিশালী। মার্কিন রাজনীতিতে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্প এই ইহুদি ভোট একচেটিয়াভাবে পেয়েছেন। তা সত্ত্বেও জো বাইডেন যে ভোটযুদ্ধে এতটা এগিয়ে তার কারণ, আমেরিকায় বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদবিরোধী শাদা মানুষ, বিশাল কালো সম্প্রদায় এবং ইমিগ্র্যান্টরা বহু বছরের অত্যাচার, অবিচার ও বৈষম্য দ্বারা পীড়িত হয়ে এবার দারুণভাবে ঐক্যবদ্ধ। তারা চেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপসারণ। তার বিরুদ্ধে যদুমধু যে-ই দাঁড়াক, তাকে তারা ভোট দেবেন। জো বাইডেনকে তারা ভালোভাবে জানেন না। জো বাইডেন তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবেন কি না, তা-ও তারা জানেন না। তবু ট্রাম্পের মতো এক স্বৈরাচারী স্বভাবের মানুষকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য তারা যাকে হাতের কাছে পেয়েছেন তাকেই ভোট দিয়েছেন।
জো বাইডেন আগে বারাক ওবামার আমলে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ছোটখাটো স্খলন-পতনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। তার প্রথম স্ত্রী সন্তানসহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলে তিনি আ্ত্তহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। আচার-আচরণে ভদ্র মানুষ। আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ট্রাম্পের সৃষ্ট অরাজকতা দূর করতে পারবেন বলে অনেকেই আশা করেন। সম্ভবত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে পারবেন এবং চীনের সঙ্গে আমেরিকার যে নরম-গরম ্লায়ুযুদ্ধ চলছে, তারও তিনি অবসান ঘটাতে না পারেন, উত্তেজনা কমিয়ে আনবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে বাইডেন কোনো নীতি পরিবর্তন ঘটাবেন মনে হয় না। সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও ট্রাম্পের মতো একই কাজ করেছিলেন। মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে ইসরাইলের বন্ধু বানিয়ে দিয়ে আরব ঐক্যে ফাটল ধরানোসহ প্যালেস্টাইনের মুক্তিসংগ্রামকে হতাশ করে দিয়েছিলেন। ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, ইহুদি তোষণনীতি বদলাবে মনে হয় না। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি জো বাইডেন নতুন কোনো নীতি গ্রহণ করতে চাইবেন তা-ও মনে হয় না। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সাধারণত আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের মধ্যে বড় রকমের কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। সুতরাং জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে বিশ্বে আমেরিকার হারানো নেতৃত্ব উদ্ধার করার চেষ্টা শুরু করবেন।
 তাকে নিয়ে মানুষের মনে বড় রকমের প্রত্যাশা না থাকাই ভালো। ট্রাম্প গেলে বিশ্বরাজনীতিতে উত্তেজনা কমবে, হয়তো করোনার প্রাদুর্ভাবও কমবে—এটাই হবে মানুষের সবচাইতে বড় প্রাপ্য।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি